আজ পহেলা বৈশাখ: স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৪

0 Posted by - April 14, 2017 - ইতিহাস-ঐতিহ্য
Smiley face

আজ শুক্রবার পহেলা বৈশাখ। সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হয়েছে নতুন বছর ১৪২৪। স্বাগত বাংলা নববর্ষ। আজ বর্ষবরণ নয় শুধু, বাঙালির অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক জাগরণের উৎসবে যোগ দেবে সারাদেশ। এবার প্রথমবারের মতো সারাদেশের প্রায় ৩০ হাজার সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করা হবে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। তপোবহ্নির শিখা জ্বালো জ্বালো/নির্বাণহীন নির্মল আলো…। অফুরান এই আলোয় উদ্ভাসিত হবে দেশের মানুষ।

নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে দেশের বৌদ্ধদের সর্বাচ্চো ধর্মীয় গুরু বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সংঘরাজ ভদন্ত ধর্মসেন মহাস্থবির ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভার সংঘনায়ক ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরো সর্ব প্রাণীর প্রতি মৈত্রী জানিয়ে আর্শিবাদ জানিয়েছেন।

বছরের প্রথম দিনে আজ নতুন নতুন স্বপ্ন বুনবে বাংলার কৃষক। হালখাতা খুলবে ব্যবসায়ীরা। সরাকারি ছুটির দিনে রাজধানীসহ সারাদেশে একযোগে চলবে লোকজ ঐতিহ্যের নানা উৎসব অনুষ্ঠান।

লোক ঐতিহ্যের প্রধান শক্তি অসাম্প্রদায়িকতা মানবিক মূল্যবোধ সাম্য সুন্দর শান্তির বাণী নিয়ে এসেছে বৈশাখ। আজ হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির আলোয় নতুন করে জ্বলে উঠবে বাঙালি। অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে রাখার অনুপ্রেরণা গ্রহণ করবে। দ্রোহের আগুনে শানিত হবে। বাঙালির চেতনাবিরোধী অপশক্তি রুখতে নতুন বছরে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেবে বাংলাদেশ। বাঙালি পুরনো বছরের সকল অপ্রাপ্তি ভুলে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জঙ্গিবাদ ও রাজাকারমুক্ত একটি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বাঙালি পালন করবে বৈশাখী উৎসব।

কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন।

১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে।

পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে।

দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। সম্প্রতি (২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর) ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সার্বজনীন উৎসবে। পহেলা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারাদেশ। আজ বর্ষবরণের এ উৎসব আমেজে মুখরিত থাকবে বাংলার চারদিক। গ্রীষ্মের খরতাপ উপেক্ষা করে বাঙালি মিলিত হবে তার সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসবে। দেশের পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসব মুখরতার বিহ্বলতা।

আবহমান কাল ধরেই চলছে বৈশাখ বরণের আনুষ্ঠানিকতা। প্রকৃত রূপটি দৃশ্যমান হয় গ্রামে। একসময় গ্রামবাংলায় চৈত্রসংক্রান্তি ছিল প্রধান উৎসব। বছরের শেষ দিনে তেতো খাবার খেয়ে শরীর শুদ্ধ করতেন কৃষাণ-কৃষাণীরা। নির্মল চিত্তে প্রস্তুত হতেন নতুন বছরে প্রবেশ করার জন্য। এখনও বৈশাখ বরণের অংশ হিসেবে বাড়িঘর ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করেন গৃহিণীরা। অদ্ভুত মুন্সিয়ানায় আল্পনা আঁকেন মাটির মেঝেতে। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন সবাই। স্নান সারেন। নতুন পোশাক পরেন। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে যান। ঘরে ঘরে সাধ্যমতো বিশেষ খাবার রান্না করা হয়। থাকে পিঠা-পুলির আয়োজন। আজ হাটে-মাঠে-ঘাটে বসবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। নানা রকম কুটির শিল্প, খেলনা, মিষ্টিসহ বাহারি পণ্যে স্টল সাজানো হবে। বিভিন্ন এলাকায় থাকবে নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা কিংবা কুস্তির মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।

বাংলা নববর্ষে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ রীতি এখনও এদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির আমেজ নিয়ে উৎসবের পরিধির আরো বিস্তার ঘটিয়েছে। কৃষক সমাজ আজও অনুসরণ করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। এককালে কেবল গ্রামাঞ্চলেই পয়লা বৈশাখের উৎসবে মেতে উঠতো মানুষ। নানা অনুষ্ঠান, মেলা আর হালখাতা খোলার মাধ্যমে তখন করানো হতো মিষ্টিমুখ। এখন আধুনিক বাঙালি তাদের বাংলা নববর্ষকে সাজিয়ে তুলছে মাতৃভূমির প্রতিটি আঙিনায় আরও বেশি উজ্জ্বলতায়।

নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে।

বাংলা ১৪২৩ সনকে বিদায় এবং নববর্ষ ১৪২৪ বরণকে কেন্দ্র করে তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসী সম্প্রদায় প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক অনুষ্ঠানমালা পালন করছে।

বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়, এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেক পোস্ট। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

No comments

Leave a reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।