আধুনিক যুগে বৌদ্ধধর্ম

0 Posted by - December 31, 2016 - ইতিহাস-ঐতিহ্য, এক্সক্লুসিভ, ছবি
Smiley face

বর্তমানে অন্যান্য ধর্মের মতো বৌদ্ধধর্মও বাংলাদেশে যথাযথ মর্যাদার অনুশীলিত হচ্ছে।এ দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের মতো স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক।সকলের সাথে সৌভ্রাতৃত্ববোধ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে ধর্ম অনুসরণ করা বৌদ্ধদের অন্যতম ঐতিহ্য।বৌদ্ধরা সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানসমূহ পালন করে চলেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে হলে চাকমা, মারমা ও বড়ুয়া বৌদ্ধদের সম্মিলিত ইতিহাস জানা দরকার। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এ তিনটি পার্বত্য জেলায় চাকমা, মারমা, রাখাইন, তঞ্চঙ্গা, চাক, খিয়াং প্রভৃতি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি বসবাস করে।কিছু রাখাইন পটুয়াখালি, বরগুণা অঞ্চলে বসবাস করে। বড়ুয়া, চৌধুরী ও সিংহ উপাধিকারী বৌদ্ধরা যথাক্রমে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ‍কুমিল্লা প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাস করে।এদের ইতিহাসেই বাংলাদেশের বৌদ্ধদের ইতিহাস।

চাকমা রাজা জানবক্স খান ১৮০০ সালে মৃত্যু বরণ করেন।তিনি সারা জীবন ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কাটান।জানবক্স খানের মৃত্যুর পর ধরম বক্স খান রাজা হন।তাঁর মৃত্যুর পর রানি কালিন্দী রাজত্ব করেন।দীর্ঘদিন ইংরেজরা তাঁকে রানি স্বীকার করেননি।১৮৪৪ সালে ইংরেজরা তাঁকে সরকারিভাবে পার্বত্য সার্কেলের প্রধান হিসেবে ‘রানি’ বলে স্বীকার করেন।তিনি ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন।১৮৬০ সালে পার্বত্য এলাকাকে নিয়ে ইংরেজরা পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন করে।

ব্রিটিশ শাসন আমলে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো বৌদ্ধরাও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।এ সময় বিদ্যাশিক্ষার জন্য তারা কলকাতায়ও যেতে থাকেন।ধর্মীয় শিক্ষার জন্য অনেকে মিয়ানমার,(তৎকালীন বার্মা) শ্রীলঙ্কায় ও থাইল্যাণ্ড গমন করেন।ঊনবিংশ শতকে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা শিক্ষা অর্জন ও জীবিকার জন্য ব্রিটিশ শাসনের অধীন আর্থিক ও শিল্প সমৃদ্ধ অঞ্চলে গমন করতে থাকেন।সরকারী ও বেসরকারি চাকরি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, শিক্ষক ইত্যাদি পেশাজীবি ও ব্যবসা প্রভৃতি পেশায় আত্মা নিয়োগ করে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা আর্থিক সমৃদ্ধি লাভ করতে থাকে।ফলে তারা নৈতিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশের জন্য নব উদ্যমে ধর্ম চর্চা শুরু করে।এ উদ্দেশ্যকে সফল করার ক্ষেত্রে বৌদ্ধভিক্ষুগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ব্রিটিশ আমলে বৌদ্ধদের মধ্যে আত্মশক্তিতে বলিয়ান হওয়ার যে প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান আমলে তা আরো সমৃদ্ধি লাভ করে।এর অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রাজ্ঞ বৌদ্ধভিক্ষুদের সঠিক দিক নির্দেশনা এবং তাঁদের নির্দেশিত কর্মকাণ্ডে গৃহী বৌদ্ধরদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।একতাই মুক্তি এ উপলব্ধিতে বৌদ্ধরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে থাকে।কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারলেন যে, পরাধীন থেকে কখনো উন্নতি করা সম্ভব নয়।ফলে সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের সাথে হাত মিলিয়ে তাঁরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়।স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ১৯৭১ সারে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।এজন্য বৌদ্ধরা পাকিস্তানী সৈন্যদের রোষানলে পড়ে।তাঁরা বৌদ্ধদের হত্যা, সম্পদ লুট এবং মা-বোনদের ধর্ষন করে।বিহার ও বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করে।ফলে বৌদ্ধসম্প্রদায় আর্থিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে।কিন্তু স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে নতুনভাবে আবার দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করে।স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার প্রেরনায় সকল সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ করে এ দেশকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করতে থাকে।

বৌদ্ধভিক্ষু ও গৃহী বৌদ্ধরা সম্মিলিত হয়ে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি করে এদেশের সমৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলেছেন।বাংলাদেশ সরকারও বৌদ্ধদের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিকাশে নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার বৌদ্ধদের কল্যানে ‘বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করেছে।এছাড়া ঢাকায় অবস্থিত ‘বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড’ থেকে পালি ভাষা ‍ও সাহিত্য বিষয়ে সার্টিফিকেট পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।এর অধীনে দেশে প্রায় ১১৫টির মতো পালি টোল ও কলেজ আছে।বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে বি.এ অর্নাস, এম. এ এম. ফিল ও পিএইচ. ডি পর্যায়ে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে।

বৌদ্ধদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।তার মধ্যে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি সবচেয়ে প্রাচীন।১৮৮৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।১৯৫০ সালে বৌদ্ধ কৃস্টি প্রচার সংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।এছাড়া আরও কিছু বৌদ্ধ সংগঠন আছে।সেগুলোর মধ্যে পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ, বাংলাদেশ সঙ্ঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা, বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষুমহাসভা, রাখাইন মারমা সঙ্ঘ কাউন্সিল, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ, বাংলাদেশ ‍বুড্ডিস্ট ফেডারেশন, বাংলাদেশ মারমা বুড্ডিস্ট এসোসিয়েশন, উত্তরবঙ্গ বৌদ্ধ পরিষদ উল্লেখযোগ্য।

খননকার্যের ফরে বাংলদেশে কুমিল্লা, বগুড়া, দিনাজপুর, নওগাঁ, রাজশাহী, সাভার, নরসিংদি, চট্টগ্রাম, প্রভৃতি অঞ্চলে বহু প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিস্কৃত হয়েছে।এগুলো বাংলাদেশের বৌদ্ধদের অতীত ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে।এগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুতত্ত্ব অপরিসীম।তন্মধ্যে সোমপুর মহাবিহারকে ইউনেসকো ‘বিশ্ব-ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা প্রাচীন বিহারের ধ্বংসাবশেষ দেখতে আসেন।ফলে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের পরিচিতি ও মান-মর্যাদা অনেক ‍বৃদ্ধি পায়।বাংলাদেশ সরকার এসব প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য সযত্নে সংরক্ষণ করে চলছে।বর্তমানে বাংরাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক বিহার আছে।তন্মধ্যে অনেক বিহার নানা কারণে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।এগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের পটিয়ার ঠেগরপুনি বুড়া গোঁসাই বিহার, পাহাড়তলী মহামুনি বিহার, উনাইনপুরা লংকারাম বিহার, বাগোয়ানের ফরাচিন বিহার, চট্টগ্রাম মহানগরীতে নন্দন কানন বৌদ্ধ বিহার, নবপণ্ডিত বিহার, রাউজান সুদর্শন বিহার, কাপ্তাই চিৎমরম বিহার, রাঙ্গামাটির রাজবন বিহার, কক্সবাজার অগগমেধা বৌদ্ধ বিহার, বান্দরবান রাজবিহার, বান্দরবানের উজানী পাড়া বৌদ্ধ বিহার, বান্দরবানের স্বর্ণ মন্দির, রামুর রামকোট বিহার, মানিকছড়ি রাজবন বিহার, ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার উল্লেখযোগ্য।

বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে মেলা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।বর্তমানে বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে অনেক মেলা অনুষ্ঠিত হয়।মেলাগুলোকে বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনন্য উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়।কারণ এসব মেলায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ধর্মীয় নাটক, গান ও বুদ্ধ কীতনের আয়োজন হয়।এগুলোর মধ্যে চক্রশালা মেলা, রাঙ্গামাটি রাজবন বিহার মেলা, মানিকপুর পরিনির্বাণ মেলা, মছদিয়া চৈত্য মেলা, ঠেকগপুনি বুড়াগোঁসাই মেলা, বিনাজুরি পরিনির্বাণ মেলা, ইছামতি ধাতুচৈত্য মেলা, লাঠিছড়ি বুদ্ধ মেলা, শীল ঘাটা মহাপরিনির্বাণ মেলা, আবুরখীল কেন্দ্রীয় যোগেন্দ্র বৌদ্ধ বিহার মেলা, পাঁচরিয়া গন্ধকুটি বিহারে শীলাবুদ্ধ ও বাইশ ‍বুদ্ধের মেলা, ঢেমশা শাক্যমুনি মেলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

রাজধানী ঢাকায় বৌদ্ধদের ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয় ১৯৫০ সালে।এ সময় ঢাকায় চাকরির সুবাদে বসবাসরত বৌদ্ধরা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতো।পরবর্তিতে ১৯৬০ সালে ঢাকায় প্রসিদ্ধ ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়।এর মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বৌদ্ধদের ঢাকায় ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার আবহ সৃষ্টি হয়।বর্তমানে ঢাকায় অনেক বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেগুলো বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, বাংলাদেশ বৌদ্ধ মহাবিহার, ধর্মজ্যোতি বৌদ্ধ বিহার, সাভার রাজবন বিহার।ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমরে অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু ও গৃহী বৌদ্ধ সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।সংখ্যায় কম হলেও অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বৌদ্ধ সম্প্রদায় বাংলাদেশে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে।

  • -সূত্র: জাতীয় পাঠ্য পুস্তক, বৌদ্ধধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা নবম-দশম শ্রেণি।

 

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

No comments

Leave a reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।