উপকূলের আদিবাসী রাখাইনদের রাখাইন থাকার সংগ্রাম

0 Posted by - June 26, 2017 - সমাজ ও সংস্কৃতি
Smiley face

রাখাইনদের সব শ্মশানেই থাকে দুটি অংশ। শ্মশানকে তারা বলে চানসাই। ধর্মীয় বিশ্বাসে রাখাইনরা শতভাগ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী; তবে বাঙালি বৌদ্ধ, এমনকি অন্য আদিবাসী বৌদ্ধদের সঙ্গেও রাখাইন রীতিনীতির বেশ ফারাক রয়েছে। রাখাইন রীতি অনুযায়ী শ্মশানের দুটি অংশের একটিতে অতিথিদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। রাখাইনদের ঐতিহ্য অনুযায়ী তারাই অতিথি, যারা তাদের গ্রামের বাইরে মারা যান। অন্য শ্মশানটিতে গ্রামে যাদের মৃত্যু হয় তাদের শেষকৃত্য সম্পাদন করা হয়। এই রাখাইন রীতিটি এখন অনেকেই বোঝা বলে মনে করেন।

কুয়াকাটার গোড়াআমখোলা পাড়ার ম্যাথিউস রাখাইন গত বছর ১০ মার্চ তার বাবা উ মং মারা যাওয়ার পরে এ নিয়ে এক মহাসমস্যায় পড়েন। তার বাবা তাদের গ্রামের বাইরে মারা যান এবং রাখাইন রীতি অনুযায়ী তিনি অতিথি বলে গণ্য হন। গোড়াআমখোলা গ্রামের শ্মশানে এখন আর অতিথি সৎকারের অংশটি নেই। ভূমিদস্যুরা ওই অংশটি অনেক আগেই দখল করে নিয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে ম্যাথিউসের বাবার শেষকৃত্য করতে হয় তাদের বাড়ির আঙিনায়। রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা করতে না পারায় ব্যথিত ম্যাথিউস। ম্যাথিউসের মতোই সমস্যার শিকার হচ্ছে পটুয়াখালী ও বরগুনার রাখাইনরা। তাদের বেশিরভাগ শুধু শ্মশানের জায়গা সংকটের কারণেই যে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারে না তা নয়, দারিদ্র্যও একটি বড় সংকট। রাখাইনদের রীতি অনুযায়ী কেউ মারা গেলে তাকে সঙ্গে

সঙ্গে দাহ বা কবর দেওয়া হয় না। মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখা হয় কয়েক মাস। ওই সময় প্রতি সন্ধ্যায় গ্রামবাসী মৃতদেহের পাশে মোম জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে। নিজের বাবার বেলায় ম্যাথিউস এটা করতে পারেননি। এই না পারার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানালেন ম্যাথিউস। ৪২ বছর বয়সী পেশায় প্রকৌশলী ম্যাথিউস পুরো আচার-অনুষ্ঠান শেষ করে শেষকৃত্য করার ঘটনাটি দেখেছেন ২৪ বছর আগে, ১৯৯৩ সালে। ওই বছর তাদের গ্রামের পুরোহিত মারা যান। গ্রামবাসী ওই পুরোহিতের দেহ তাদের রীতি অনুযায়ী সংরক্ষণ করে রাখে কয়েক মাস। প্রতি সন্ধ্যায় তারা ওই মরদেহের পাশে মোম জ্বালিয়ে প্রার্থনা করত। পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলে বসবাসকারী রাখাইনরা এখন আর এমন রীতিনীতি মেনে শেষকৃত্য করার কথা চিন্তাই করতে পারে না।

ম্যাথিউস এই পরিস্থিতিকে রাখাইনদের রাখাইন থাকতে না দেওয়ার উদাহরণ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, রীতিনীতি হারানোর পরও রাখাইন থাকার সংগ্রাম চালিয়ে খুব বেশিদিন এই দেশে থাকতে পারবেন না বোধ হয়। অন্য রাখাইনদের মতো হয়তো ম্যাথিউসেরও শরণার্থী হয়ে মিয়ানমারে চলে যেতে হবে। যেভাবে হাজার হাজার রাখাইন যাচ্ছে অনেক দিন ধরে।

ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের দিক দিয়ে মূলধারা থেকে আলাদা রাখাইন ছেলেমেয়েদের সংকট শুরু হয় শৈশবে বিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা রাখার পর থেকেই। রাখাইন নারী মেইনথিন প্রমিলা চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে চারটি ভাষা শিখতে হয়েছে বলে জানালেন। একটি তার মাতৃভাষা রাখাইন। তারপর শিখেছেন বাংলা, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা। তিনি এখন কারিতাস বাংলাদেশে কর্মরত। প্রমিলা বলেন, তার স্কুলজীবনের সহপাঠীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছেন। কলেজে তার সহপাঠীদের মধ্যে কোনো রাখাইন ছেলে ছিল না। একমাত্র রাখাইন সহপাঠীটিও ছিলেন একটি মেয়ে। প্রমিলা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্বে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রমিলা বলেন, ভাষাগত সমস্যার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চৌকাঠ ডিঙোবার আগেই বেশিরভাগ রাখাইন ছেলেমেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রমিলা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভাষাসংগ্রামী উসুয়ে হাওলাদারের ছোট ভাইয়ের মেয়ে। ফলে প্রমিলাদের পরিবারে পারিবারিকভাবেই রাখাইন ভাষার সঙ্গে বাংলার চর্চা রয়েছে বহুকাল ধরে।

ভাষাসংগ্রামী উসুয়ে হাওলাদার পরবর্তী জীবনে ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এবং সত্তরের নির্বাচনে সারাদেশে যখন আওয়ামী লীগের জয়জয়কার, তখন ন্যাপ থেকে নির্বাচন করে উসুয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন। উসুয়ের ছেলে টেন সুয়ে বলেন, পঁচাত্তরের পর থেকে সংকটটা তীব্রতর হয়। এই সময়কালে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ২নং বড় বাইশদিয়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানপাড়া, দক্ষিণ তুলাতলী, কানকুনিপাড়া ও থেলাবুনিয়া মৌজার গাববুনিয়ায় রাখাইনদের এক হাজার ২৩৫ দশমিক ১২ শতাংশ সম্পত্তি অর্পিত করা হয়েছে। ক তফসিলের ৪৯০ দশমিক ৪২ শতাংশ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান এবং খ তফসিল ৭৪৪ দশমিক ৭০ শতাংশ অবমুক্তি হয়েছে রাখাইনদের পক্ষে। পৈতৃক নিবাস রাঙ্গাবালী হলেও উসুয়ে সবসময়ই কলাপাড়ায় বাস করতেন এবং এখানেও রাখাইনদের অবস্থা ভালো নেই। ২০১৫ সালে উসুয়ে মারা যাওয়ার পর তার মরদেহ দাহ করতে হয়েছে হিন্দুদের শ্মশানে। কলাপাড়ায় এখনও বেশ কিছু রাখাইন শ্মশানের অস্তিত্ব রয়েছে, যেগুলোর চারদিক এমনভাবে বেদখল হয়ে গেছে, চাইলেও সেগুলোতে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা করা যায় না।

পটুয়াখালী ও বরগুনার সর্বত্র রাখাইনদের শ্মশানগুলো জবরদখল হয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। কলাপাড়ার ছআনিপাড়ার চিং দামো তাদের শ্মশানটিকে প্রতিনিয়ত অপবিত্র করা এবং মন্দিরটি একেবারে পাড়ার ভেতরে সরিয়ে আনতে বাধ্য হওয়ার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ছআনিপাড়ার দেড়শ’ বছরের প্রাচীন শ্মশান থেকে শুরু করে বরগুনার তালতলী উপজেলার অংকুজানপাড়ার খাদ্যা সং চানসাই শ্মশান দখল হয়ে গেছে। একই অবস্থা কলাপাড়ার থঞ্জুপাড়া, মিশ্রীপাড়া, দিয়াড়আমখোলাপাড়া, কালাচানপাড়া, তুলাতলী, নয়াপাড়া-বাবলাতলা, সোনাপাড়া, চইয়াপাড়া, হাড়িপাড়ার শ্মশানগুলোর ক্ষেত্রেও।

মার্চের মাঝামাঝি একদিন তালতলীর অংকুজানপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ভূমিদস্যুদের অব্যাহত আগ্রাসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে এই রাখাইন গ্রামের পরিধি। একসময় যেখানে অর্ধশতাধিক রাখাইন পরিবার বসবাস করত, সেখানে বর্তমানে মাত্র ১১টি পরিবার রয়েছে। সবচেয়ে জবরদখলের মুখে রয়েছে রাখাইনদের শ্মশানভূমি, যে শ্মশানে জড়িয়ে রয়েছে তাদের পূর্বসূরিদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য, তাদের আবেগ ও অনুভূতি। দাহ করার আগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য সাময়িকভাবে শবদেহ রাখার স্থানটি জনৈক মো. ইউনুস দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। জানতে চাওয়া হলে ২৭ হাজার টাকার বিনিময়ে জায়গাটি কিনে নিয়েছেন বলে দাবি করেন। রাখাইনরা ইউনুসের এ দাবি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে। শ্মশান ও দেবালয় দেবোত্তর সম্পত্তি এবং ওই সম্পত্তি কেউ বিক্রি করতে পারে না। গ্রাম থেকে শ্মশানে শবদেহ নেওয়ার রাস্তাও ঘেরা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন ওই ইউনুস গং।

সহকর্মী সমকালের কুয়াকাটা প্রতিনিধি খান এ রাজ্জাক বড় হয়েছেন অনেক রাখাইন ছেলেমেয়ের সঙ্গে। তিনি কষ্ট পান এটা দেখে যে, রাখাইনদের যারা এখনও টিকে আছে, তারা তাদের রীতিনীতি এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের অনেক কাঙ্ক্ষিত খাবার এখন আর প্রকৃতিতে নেই। রাজ্জাকের বয়স এখন ৪০ বছর। খুব বেশিদিন আগের কথা না, ছোটবেলায় তিনি নিজেই দেখেছেন উপকূলের বনবাদাড়ে বন্য শূকর পাওয়া যেত। কাঁকড়া, কুইচ্যা, শামুক, ঝিনুক, কাছিম, গুইসাপ, খেঁকশিয়াল ইত্যাদি ছিল সুলভ। এখন আর এগুলো মেলে না। বাঙালিরা অবিবেচকের মতো বন ধ্বংস এবং বনের প্রাণী নিধন করেছে। রাজ্জাক বলেন, বাঙালিরা বুঝতে নারাজ রাখাইনদের আলাদা একটা সংস্কৃতি রয়েছে। রাখাইন সংস্কৃতি বলতে প্রশাসনের কর্তারা আবার শুধুই নাচ-গান বুঝে থাকেন।

রাজ্জাকের কথার সূত্রে মনে পড়ে মার্চে ঢাকা থেকে রাখাইন জনপদ পরিদর্শনে যাওয়া নাগরিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ বি এম সাদিকুর রহমানের দেওয়া বক্তব্য। এই প্রতিবেদকও ওই নাগরিক প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য। ইউএনও সেদিন বলেছিলেন, এলাকার রাখাইনরা এ দেশের নাগরিকদের কেবল পরম আত্মীয় নন, তারা এলাকার সম্পদও বটে। কেননা এলাকায় রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথি এলে রাখাইনদের নাচ-গান অনুষ্ঠানকে উজ্জ্বল করে। রাখাইনদের মধ্যে দুয়েকটি সমস্যা থাকলেও তারা সুখে-শান্তিতে আছে বলে উল্লেখ করে তিনি রাখাইনদের সমস্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে রাখাইনদের অধিকতর নাগরিক অধিকার দেওয়া হয় বলেও তিনি অবহিত করেন। পরিশেষে তিনি রাখাইনদের ঘরকুনো বলে অভিহিত করে কেবল কৃষিকাজে পড়ে না থেকে বিকল্প পেশায়, যেমন ভ্যান চালানোর পরামর্শ দেন।–দৈনিক সমকাল।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

No comments

Leave a reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।