এই বুদ্ধ পূর্ণিমায় বুদ্ধের উপদেশ প্রতিপালনই হোক বুদ্ধকে কলঙ্ক আরোপকারীদের প্রতি সর্বোচ্চ প্রতিবাদ

Smiley face

এস. জ্ঞানমিত্র ভিক্ষুঃ গৌতম বুদ্ধ একই পূর্ণিমা তিথিতে জন্ম নেন, বুদ্ধত্ব বা পূর্ণজ্ঞান লাভ করেন এবং মহাপরিনির্বাণ বা দেহত্যাগ করেন। বুদ্ধ জীবনের এই ঘটনাত্রয়ের অনেকগুলো সমিল ঘটনাবলীর মধ্যে অন্যতম হল তাঁর জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহানির্বাণ(চিরপ্রয়াণ) প্রতিটিতেই বৃক্ষ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাঁর জন্ম শালবৃক্ষ তলে, বুদ্ধত্ব লাভ হয় অশ্বত্থ বৃক্ষ তলে এবং দেহত্যাগও হয় শালতরুতলে। প্রতিটি ঘটনাতে প্রকৃতি-পরিবেশের ঘনিষ্ঠতা বুদ্ধ জীবনে পরিস্ফুটিত হয়েছে। আরো বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে সাম্য-সৌম্যতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের মহান ধারক ও বাহক গৌতম বুদ্ধ ৬২৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ৬ এপ্রিল শুক্রবার বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে হিমালয়ের পাদদেশে(বর্তমান নেপালের তরাই অঞ্চলে) শাক্যজাতির রাজা শুদ্ধোধনের ঔরসে ও রাণী মহামায়াদেবীর গর্ভ হতে কপিলবাস্তু নগরী ও দেবদহ নগরীর মধ্যস্থলের লুম্বিনী নামক উদ্যানে একটি শাল বৃক্ষের তলে জন্ম নেন। অতঃপর তিনি বৃদ্ধ, রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, মৃতদেহ ও সন্ন্যাসী এই চারটি দৃশ্য দেখে শঙ্কিত হওতঃ জগতের দুঃখ দূর করার দৃঢ় মানসিকতায় ২৯ বছর বয়সে ৫৯৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১৮ডিসেম্বর সোমবার গৃহত্যাগ করেন। তদনন্তর তিনি ৬ বছর বনে বনে ঘুরে ঘুরে সাধনা করলেন কঠোরভাবে। কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনায় ঈস্পিত পথ বা দুঃখমুক্তি মার্গ না পেয়ে মধ্যপথ অবলম্বন অর্থাৎ অতিরিক্ত ভোগ বিলাসও নয় আবার কঠোর তপস্যাও নয় এ দু’য়ের মাঝামাঝি তপস্যা করে তিনি ভারতের বিহার রাজ্যের বোধগয়া থানান্তর্গত বুদ্ধগয়ার নৈরঞ্জনা নদীর তীরস্থ একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে (যা বর্তমানে বোধিবৃক্ষ নামে জগদ্বিখ্যাত) ৩৫ বছর বয়সে ৫৮৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১০ এপ্রিল বুধবার পরম জ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেন। সেই হতে তিনি ‘বুদ্ধ’ অর্থাৎ পরমজ্ঞানী এই অভিধায় অভিহিত হন। আবার এই বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতেই ৫৪৪ খ্রিষ্টপুর্বাব্দের ২২ এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে মঙ্গলবার ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ গোরক্ষপুর জেলার কুশীনগরের মল্ল নামক জাতির আয়ত্তাধীন শালবনের যুগ্ম শালবৃক্ষতলে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। একই পূর্ণিমা তিথিতে ও বৃক্ষতলে-প্রকৃতি সংলগ্ন হয়ে জন্ম, জ্ঞানলাভ ও দেহত্যাগ আর কোন মহাপুরুষের বেলায় দেখা যায় না।  বৈশাখী পূর্ণিমার তিথিতে জন্ম, বুদ্ধত্ব ও পরিনির্বাণলাভী এই মহতোমহান মানবপুত্র বুদ্ধের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হল- (১) জগতে দুঃখ আছে, (২) দুঃখের কারণ আছে, (৩) দুঃখের নিরোধ বা ধ্বংস আছে এবং (৪)দুঃখকে নিরোধের উপায়ও আছে এই চারটি মহান সত্য, যেগুলোকে বৌদ্ধ দর্শনে চতুরার্য সত্য বলা হয়। তিনি দুঃখ নিরোধের উপায়ের কথা বলতে গিয়ে আটটি উপায়ের কথা বলেছেন। সেগুলো হল- (১)সম্যক দৃষ্টি- চতুরার্য সত্য সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান। এ জ্ঞান মানসিক-বাচনিক-কায়িক সুকর্ম ও কুকর্ম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভে সহায়তা করে। (২)সম্যক সংকল্প- ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য বাড়ানোর সংকল্প দ্বারা নিজের ও অপরের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই রাগ, হিংসা ও প্রতিহিংসাহীন সবার উপর মৈত্রীপূর্ণ মনোভাব পোষণের সংকল্প থাকা দরকার। (৩)সম্যক বাক্য- মিথ্যা-কটু-বৃথা-ভেদ বাক্য হতে বিরত থাকা উচিত। কেননা, এতে সমাজে ঝগড়া বিবাদ, হিংসা-প্রতিহিংসা দেখা দিতে পারে। সত্য-প্রিয়-মিষ্ট ও অর্থপূর্ণ বাক্যে সমাজে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে। (৪)সম্যক কর্ম- হিংসা, চুরি, ব্যভিচারপূর্ণ কাজ হতে বিরত থাকলে সমাজের কল্যাণ বৃদ্ধি পাবে। সবার উচিত বিভিন্ন ক্ষতিকর সমাজ বিরোধি কাজ হতে নিজেদের দূরে রাখা ও অপরকে দূরে থাকতে সহায়তা করা। (৫)সম্যক জীবিকা- সমাজের জন্য ক্ষতিকর জীবিকা গ্রহণ না করে সৎ ও সহজ-সরল এবং ন্যায়ভিত্তিক জীবিকার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা যাতে সমাজের ও নিজের কল্যাণ সাধিত হবে। (৬)সম্যক প্রচেষ্টা- খারাপ চিন্তাকে মনে প্রশ্রয় না দেয়া, মনে খারাপ চিন্তা আসলে তা ধ্বংস করা, সর্বদা ভাল চিন্তা করার চেষ্টা করা এবং ভাল চিন্তা বৃদ্ধি ও স্থিতির চেষ্টা করা। (৭) সম্যক স্মৃতি- সঠিক বোধ শক্তি। এটি ভুল মনোযোগকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং মনকে খারাপ পথে যেতে বাধা দেয়। সদা নির্ভুল চিন্তা করাই হলো সম্যক স্মৃতি। ও (৮) সম্যক সমাধি- চিত্তের একাগ্রতাই হচ্ছে সম্যক সমাধি। অর্থাৎ উন্নত চিন্তার সক্রিয় অনুশীলন। চিত্তের অস্থিরতা ধ্বংস করা এটির লক্ষণ এবং অচঞ্চল ভাবে অবস্থান করানো এর কাজ। উল্লেখ্য, এটিই হলো মধ্যম পথ যা অনুশীলনে সিদ্ধার্থ গৌতম ‘বুদ্ধত্ব’ লাভ করেছিলেন। বুদ্ধের জীবনের এই মহান ত্রি-স্মৃতি জড়িত থাকার কারণে বৈশাখী পূর্ণিমা বিশ্বে ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ রূপে সুখ্যাত। জাতিসংঘ ‘বেসাখ ডে’ হিসাবে এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠন এ দিনটিকে সাড়ম্বরে ও গারবতার মাধ্যমে উদ্যাপন করে।

ইদানিং আমরা এমন একটি সময় অতিক্রম করছি যেখানে সত্যের-ন্যায়ের-সাম্যের-একতার বিরুদ্ধে অসত্য-অন্যায়-বৈষম্য-অনৈক্যতার চরম আঘাত ও লাঞ্চনা অহরহ ঘটে চলেছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ বর্তমানে ধর্মান্ধতা-রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার ও দখল-দূর্নীতি-হঠকারিতায় নাস্তানাবুদ হচ্ছে। এমনতরো সময়ে প্রতিবারের মতোন আবার আমাদের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে মহাকারুণিক, প্রাসাদ হতে নেমে এসে তাপিত-পীড়িতের দুঃখ নিবারণের অতিমানব, মানবপুত্র গৌতম বুদ্ধের পবিত্র ও শুভ ২৬৪১ তম জন্মতিথি ও ২৫৬১ তম বুদ্ধবর্ষ (বুদ্ধের পরিনির্বাণ সন ৫৪৪ হতেই বুদ্ধবর্ষের শুরু, আশি বছর বুদ্ধ দৈহিকভাবে বেঁচেছিলেন, সুতরাং ২৫৬১+৮০= ২৬৪১)। এই জন্মতিথির ১৬ দিন পূর্বেই বিগত ২৪ এপ্রিল ২০১৭ ইংরেজীর দৈনিক জনকন্ঠের দুবির্নীত ও অজ্ঞ সাংবাদিক নামের লজ্জা ফিরোজ মান্না দৈনিক জনকন্ঠে রিপোর্ট লিখল বুদ্ধ “সন্ত্রাসী” এবং ভাবনাকেন্দ্রগুলো সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ দেবার আখড়া ও বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘেরা সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষক। কী লজ্জা!! কী দূর্বিনয়!! কী জঘন্য মিথ্যাচার!! এবং এর পরপরই দৈনিক ইনকিলাব প্রভৃতি পত্রিকায় শুরু হল বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে নির্জলা মিথ্যাচার ও বিষেদাগার। সাধারণ বৌদ্ধ ফেটে পড়ল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে যেটি এখনো চলমান। প্রত্যাশা ও বিশ্বাস করি সদাশয় উপযুক্ত কতৃপক্ষরা এই মিথ্যাচারের যথাযথ সুরাহা করবে।

কতৃপক্ষরা সুরাহা করুক বা না করুক, আপামর বৌদ্ধদের (বিশেষতঃ সুবিধাভোগী ও সুবিধাবাদী বৌদ্ধনেতৃত্বের) মন হতে ক্ষোভ বা প্রতিবাদের শব্দগুচ্ছ উদ্গীরণ হোক বা না হোক বুদ্ধ ‘বুদ্ধ’ই। তিনি জাগরিত হয়েই গেছেন, তিনি করুণার আকর, তিনি সর্বোতভাবেই শান্ত ও প্রশান্তির রাজ্য মহানির্বাণে উপনীত। কোন নিন্দা বা প্রশংসা তাঁর উপদেশ বা অত্যুৎকৃষ্ট অমিয় বাণীর তিলমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি যা উপদেশ দিয়ে গেছেন তৎসমুদয়ই আগে যেমন মানুষের কল্যাণে মহামন্ত্র সরূপ কাজ করেছে, বর্তমানেও করছে এবং অনাদিকাল করেই চলবে।

কালে কালে বিভিন্ন দুরভিসন্ধি নিয়ে কিছু দেবদত্তের আবির্ভাব হয় বুদ্ধের চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করার জন্য, যাঁকে উদ্দেশ্য করেই কবিন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রার্থনা জানিয়েছিলেন “করুণাঘন, ধরণীতল কর কলঙ্ক শূণ্য” বলে। বড়ই হাস্যকর ও করুণার যে যিনি সকলের কলঙ্ক মোচনের জন্য মহাআশ্রয়স্থল তাঁকেই কলঙ্কিত করার নীল নক্শা। মনেই করি ফিরোজ মান্না ও তার মতোন অবৌদ্ধ ও নামধারী বৌদ্ধ কুলাঙ্গাররা যতই চেষ্টা করুর তাদের দেবদত্তগিরি হালেই পানি পাবে না। কেননা, বুদ্ধের শিক্ষা পত্রিকায় পাতায়, বইয়ের পাতায়, অনলাইন পাতায় বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় থাকায় জিনিস নয়, এসব মাধ্যম ব্যবহার করে বুদ্ধ, তাঁর প্রতিষ্ঠিত মহান সংঘের তিলমাত্র ব্যত্যয় করা যায় না। বুদ্ধের শিক্ষাদর্শ মানবের মননে ও আচরণেই থাকে, লালিত ও সংবর্ধিত হয়। সুতরাং, এই বুদ্ধ পূর্ণিমায় সকলের মননে ও আচরণে বুদ্ধের প্রতি কলঙ্ক আরোপের অপচেষ্টাকারীদের সর্বোত্তম প্রতিবাদ হোক বেশি বেশি করে বুদ্ধ বাণীর আচরণের দ্বারা সকলের কলঙ্ক মোচন।

পুনশ্চঃ, ব্যক্তি গৌতমের বিরুদ্ধে নয় ‘আদর্শ গৌতম’-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারীদের বিরুদ্ধে বুদ্ধের বাণী অনুযায়ী সদাচরণ ও নৈতিকতার মাধ্যমে সোচ্চার হোন। এবং সুযোগসন্ধানী, ‘কনের ঘরের মাসী ও বরের ঘরের পিসী’ (মেস/পিসা)দের চিনে রাখুন ও বর্জন করুন।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Recommended For You

Leave a Reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।