এ ধরণীর গর্বের ধন গৌতম বুদ্ধ

Smiley face

গৌতম বুদ্ধ কেবলমাত্র বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক বা একজন মহান দার্শনিক নন। তিনি মানবজাতির গৌরব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। হিন্দু পণ্ডিতদের অনেকে এমনকি মহাত্না গান্ধী গৌতম বুদ্ধকে মনে করতেন একজন অবতার হিসাবে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক মুসলিম গবেষক মনে করতেন যে, গৌতম বুদ্ধ একজন নবী ছিলেন। প্রথিবীতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই যাঁকে নিয়ে এত টানাটানি।—– তিনি অবতার ছিলেন কি-না বা একজন নবী ছিলেন কি-না তা জানি না, তবে এটুকু নির্দ্ধিধায় বলতে পারি, তিনি ছিলেন এ ধরণীর গর্বের ধন।

মানবতাবাদী এই মহান দার্শনিক মনব কল্যাণের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তিনি সুন্দরী স্ত্রী, শিশু-সন্তান, পিতা-মাতা এবং রাজ্য ত্যাগ করেছেন কোন স্বর্গ লাভের জন্য নয় বা কোন পরমেশ্বরকে পাবার উদ্দ্যেশ্য নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে কীভাবে দুঃখ-কষ্ট ও হতাশার হাত থেকে মুক্ত করা যায়। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে যে কঠোর কৃচ্ছ সাধনার মাধ্যমে দুঃখের হাত থেকে মুক্তির পথের সন্ধান করেছেন তার তুলনা নিনি নিজেই।

নিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি হিন্দু ধর্মের বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন দীর্ঘ ৪৫ বছর। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও শুদ্রের বিভাজন তিনি মানতেন না। সব বর্ণের মানুষকে তিনি সমান দৃষ্টিতে দেখতেন এবং সমভাবে শ্রদ্ধা করতেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সমাজে সার্বজনীনরূপে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। এখন থেকে অড়াই হাজার বছর আগে এ ধরণের উদ্যোগ যে কত বড় মাপের তা কেবলমাত্র ইতিহাসবিদ এবং সমাজতত্ত্ববিদরাই অনুধাবন করতে পারবেন।

পাশ্চাত্যের অনেকে দাবী করেন যে, দর্শনের উৎপত্তি হয়েছে গ্রীসে। কিন্তু এ কথা সথ্য নয়। গ্রীসের প্রথম দার্শনিক থেলিসের জন্মের বহু আগেই গৌতম বুদ্ধের দর্শন এ দেশকে আলোড়িত করেছিল। আজ পাশ্চাত্যের দেশগুলো অস্তিত্ববাদ (——-) যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ (———), প্রয়োগ বাদ (—-) ইত্যাদি সমকালীন দার্শনিক সম্প্রদায় নিয় গর্ববোধ করে। কিন্তু তারা জানেনা এবং আমরাও অনেকে জানি না যে এ সমস্ত দর্শনের জন্ম বিগত একশত বছরে পাশ্চাত্যে হয়নি। এ জাতীয় দর্শনের উদ্ভব ঘটেছে আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধের হাতে।

পাশ্চাত্যে অস্তিত্ববাদের উদ্ভব হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। এ দর্শনের মূল কথা হলো পৃথিবীর মানুষ দুঃখ কষ্ট বেদনার জ্বালায় অতিষ্ঠ।তাদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। কাজেই আমাদের চিন্তা-চেতনা-জ্ঞান সাধনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কী করে দুঃখের হাত থেকে বাঁচতে পারি। গত শতাব্দিতে  পাশ্চাত্যের অস্তিত্ববাদী দার্শনিকগণ যে বক্তব্য উপস্থাপন করে পৃথিবীময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সে বক্তব্যই আরও সহজ এবং সরল করে বলে গেছেন গৌতম বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর আগে। তাই অবশ্যই বলতে হবে, তিনি অস্তিত্ববাদী দর্শনের জনক।

যৌক্তি প্রত্যক্ষবাদ দর্শনের ইতিহাসে বিপ্লব এনেসে। এ সম্প্রদায়ের দার্শনিকগণ অধিবিদ্যার বিরুদ্ধে ঘোষণা করে, অধিবিদ্যাকে দর্শনের আলোচনার বাইরে ঠেলে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হলো যা যাচাইযোগ্য নয় তা-ই অর্থহীন। আর এ কারণেই তারা ঈশ্বর, আত্না, মরণোত্তর জীবন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনাকে অর্থহীন বলেছেন। কিন্তু পাশ্চাত্যে যোক্তিক প্রত্যক্ষবাদীরা যে কথা বলে সমকালীন বিশ্বে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন সে কথাই গৌতম বুদ্ধ অনেক আগে বলে গেছেন। তিনি অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দেয়া থেকে বিরত থাকতেন। কারণ এ সমস্ত বিষয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যায় না। তাই এ বিষয় সর্ম্পকে আলোচনাকে তিনি বলেছেন অর্থহীন। আর এ করণে সার্বিক মূল্যায়নের পর এ কথা অনস্বীকার্য যে তিনিওই যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদেরও জনক।

প্রয়োগবাদ্দী দর্শন মূলতঃ সমকালীন আমেরিকান দার্শনিকদের অবদান বলে মনে করা হয়। এ দর্শনের মূলমন্ত্র হলো যা কাজে লাগে অর্থাৎ যার উপযোগিতা আছে তাই অর্থপূর্ণ বা তাৎপর্যপূর্ণ।যার ব্যহারিক মুল্য নেই বা উপকারে আসে না তা নিয়ে ভাবা বা আলোচনা করা নিরর্থক। প্রয়োগবাদীদের শিক্ষা দর্শন বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সাদরে গ্ররহীত হয়েছে। এই দর্শনের যে প্রধান কথা তা হলো প্রয়োজনীয়তা বা ব্যবহারিক মূল্য বা উপযোগিতা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, গৌতম বুদ্ধ মনব ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি যিনি চিন্তা-চেতনা জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে উপযোগিতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। আর সে কারণে সার্বিক মূল্যায়নের পর নিঃসন্দেহে এবং নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনিই প্রয়োগবাদী জীবন দর্শনের জনক।

জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের মতে বৌদ্ধ ধর্ম হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এখানে বলা প্রয়োজন যে, গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা দ্বারা নিতি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কতিপয় বিষয়ে তাদের দর্শন অ অভিন্ন।

তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে, এ জগৎ দুঃখে পরিপূর্ণ এবং আমরা সবাই দুঃখের সাগরে ভাসছি। শোপেনহাওয়ার বলেন যে, “হতে চাওয়া” “বাঁচতে চাওয়া” ইত্যাদি হচ্ছে দুঃখের মূলে। গৌতম বুদ্ধও কামনা বাসনাকেই সমস্ত দুঃখের কারণ বলে মনে করতেন। তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের কামনা বাসনার শেষ নেই সেহেতু আমাদের দুঃখের শেষ নেই। শোপেনহাওয়ার বলেন, আমাদের সাধ অনন্ত তাই দুঃখও অনন্ত। তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে মৃত্যু আমাদের দুঃখের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন না, মৃত্যু দুঃখের ব্যাপারে কোন সমাধান নয়। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষাকে শোপেনহাওয়ারের কাছে অন্য যে কোন ধর্মীয় নেতার শিক্ষার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এবং মানবাজাতির কল্যাণের জন্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে আর সে কারনে খ্রিস্টান ঘরে জন্মগ্রহণ করে এবং খ্রিস্ট পরিবেশে বড় হবার পরও তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বৌদ্ধ ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম।

বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দার্শনিকও ছিলেন গৌতম বুদ্ধের প্রতি একান্ত শ্রদ্ধাশীল। জীবনের শেষ পর্যায়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি অপকটে স্বীকার করেন যে, পৃথিবীর অন্য যে কোন ধর্মের তুলনায় তিনি বৌদ্ধ দর্শনকে অধিক পছন্দ করেন। তবে বৌদ্ধ ধর্মের শুরুতে যে শিক্ষা প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেটাকেই তিনি ভালবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর মতো এই  নিবন্ধকারও মনে করেন যে, বৌদ্ধ ধর্মের প্রাথমিক স্তরেই গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ছিল অবিকৃত। আজ ২৫৫৭ বুদ্ধাব্দের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রার্থনা হোক, গৌতম বুদ্ধের মুল ও অবিকৃত শিক্ষার নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং বুদ্ধবাণী সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করুক।

  • লেখক পরিচিতিঃ ড. কাজী নূরুল ইসলাম, প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, বিশ্ব ধর্ম বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=6612

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Oct 29 2017. Filed under এক্সক্লুসিভ, প্রবন্ধ. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।