কেন ঘটল সেই দিন রামু সহিংসতা ?

Smiley face

রিপন বড়ুয়া: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জায়গা বলতে “রামু”ই ছিল একমাত্র সুপরিচিত।যেখানে মুসলিম,হিন্দু,বৌদ্ধ বলতে আলাদা কোন কিছুই ছিলনা।সকল ধর্মের মানুষেরা একসাথে মিলেমিশে উৎসব আনন্দ করত আর শান্তিতে বষবাস করত।কিন্তু সেই ভয়াল কালো রাত ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১২ তে সব কিছু পুঁড়ে ছারখার করে দিয়েছে মানুষরুপী কিছু অমানুষেরা।সেই দিনে রামুর ৩০০/৪০০ বছরের পুরাতন বৌদ্ধ বিহার থেকে শুরু করে অনেক মহামূল্যবান জিনিষপত্র,স্বর্ণ,রৌপ্য ও দামি পাথরের বুদ্ধ মূর্তি লুট সহ জ্বালিয়েছে রামুর বৌদ্ধ বাড়িঘর।

ramu_rally_the_buddhist_timesহামলার সূত্রপাত : রামুর হাইটুপী গ্রামের উত্তম কুমার বড়ুয়া নামের এক যুবকের ফেইসবুকে সম্প্রতি অপর একটি ফেইসবুক আইডি থেকে পবিত্র কোরআন শরীফ অবমাননাকর ছবি সংযুক্ত করা হয়। রামু ফকিরা বাজারের ‘ফারুক কম্পিউটার’ নামের একটি দোকানে উত্তম বড়ুয়ার ফেইসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননাকর ছবিটি দেখেন, ঐ দোকানের ফারুক, মুক্তাদির আর দেখার পর শত শত কপি প্রিন্ট প্রচার করা হয়। ওই রাতেই হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে বিশাল আকারে মিছিল বের করে। মিছিলটি রামু চৌমুহনী স্টেশন থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌমুহনী চত্বরে সমাবেশে মিলিত হয়।

মিছিল চলাকালে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। এতে ওই এলাকার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে আসতে থাকে চৌমুহনী স্টেশনের দিকে। রাত যত বাড়ে ততই বাড়তে থাকে মিছিলের সংখ্যা। রাত ১২ টার দিকে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে চৌমুহনী স্টেশনসহ আশ পাশের বৌদ্ধ পল্লী। এসময় মিছিল নিয়ে আসা লোকজন ‘বড়ুয়াদের গালে গালে, জুতা মারো তালে তালে’ এ ধরনের শ্লোগান দিতে থাকে। মিছিল ও লোকজন বাড়ার সাথে শুরু হয় তান্ডব।

হারিয়েছে দুর্লভ সংগ্রহশালা : মহামতি গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষ (ধাতু), তাল পাতার উপর বাংলা, ইংরেজি, পালি ও বার্মিজএই চার ভাষায় লেখা পাঁচ হাজারেরও বেশী ত্রিপিটক ও পূঁথি গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল সহিংস ঘটনায় পুড়ে যাওয়া রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সংগ্রহশালায়। এখানে আরো ছিল স্বর্ণ-রোপ্য,কষ্ঠি পাথর, শ্বেতপাথর, চন্দন কাঠের তৈরি চার শতাধিক বুদ্ধমূতি। এ সংগ্রহ শালায় এমনও কিছু  গ্রন্থ ছিল যা রামু ছাড়া বাংলাদেশে বিরল। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে দুস্কৃতিকারীদের তান্ডবে নিমিষে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এসব প্রাচীন সাংস্কৃতিক সম্পদ। ঐতিহ্যগত দিক বিবেচনা করলে এসব সংগ্রহ অমূল্য।

তাছাড়া বাইরের দেশ থেকে পাওয়া মহামতি গৌতম বুদ্ধের মূল্যবান ধাতু, বিরল বুদ্ধ মূর্তি সহ এবং  রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ, বর্তমানে একুশে পদক পাওয়া পন্ডিত ভদন্ত সত্যপ্রিয় মহাথের বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া  ক্রেস্ট, সার্টিফিকেটসহ উনার ২০১২ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর এর আগে বহু বছরের ভিক্ষুজীবনের সমস্ত অর্জন, সংগ্রহ সব ধ্বংস করে করে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এইটা ঠিক যে,পুঁড়ে যাওয়ার পর অল্প কয়েকমাসের মধ্যেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী “দেশরত্ন শেখ হাসিনার” সহায়তায় রামুতে নির্মিত হয়েছে “দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার”।আর এতেই রামুর সকল বৌদ্ধ সম্প্রদায়রা খুশী হয়েছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছেন।

কিন্তু রামুর সহিংসতার ঘটনার মূলকারণ আজ ও রামুর বৌদ্ধ জাতির কাছে অজানা।কীসের জন্য?কোন স্বার্থে?কোন প্রতিশোধে তারা সেই দিন এত বড় একটা হামলা চালিয়েছে।আর বিচার পাওয়ায় কথা বলতে গেলে বিগত বছর গুলোর কথা পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়। হামলার পর থেকে প্রত্যেকে রামু সহিংসতা নিয়ে মেতে ছিলেন রাজনৈতিকদল,সাহিত্যিকগণ,গণমাধ্যমকর্মী আরো অনেকেই।আর প্রশাসন ও তাদের ভূমিকা পালন করেছিল।

কিন্তু আজ রামু সহিংসতার ৪র্থ বর্ষ।কেটে গেল ৪ টা বছর কিন্তু সবাই এখন নিরব।আর রামু সহিংসতা স্মরণে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ উদ্যোগে প্রতি বছর ২৯শে সেপ্টেম্বর স্মরন সভার আয়োজন করে।আর সেই দিন রামুর বৌদ্ধদের চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোন কিছুই করার থাকেনা।কারন সকলের সামনে সেইসব লোকেরা এখনো ঘুরেবেড়ায়।যাদেরকে তারা  পত্রিকায়,ছবিতে,ভিডিওতে দেখেছে বুদ্ধের মূর্তিতে পা দিতে, দেখেছে বুদ্ধ মূর্তি ভাঙ্গতে, দেখেছে আগুনে পুড়িয়ে দিতে বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ পল্লী।আর তারা আজও সেই রামুতে বষবাস করে যারাই ধ্বংস করেছিল রামুর ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক সম্প্রীতি। আর রামু সহিংসতার যার কারনে  সৃষ্টি সেই উত্তম বড়ুয়া তার ও কোন খবর নেই বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে।একটা ছেলেকে খুঁজে বের করা কী এতই কঠিন যে ৪ বছরে ও তার কোন খবর দিতে পারল না আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।নাকি না পারার পেছনে অন্য কোন কারন।কারণ সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ভূমিকা একই। কিন্তু আমরা রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়রা প্রতিবছর স্মরনসভায় করে যাবো সেই দিনটির স্মরণে।কারণ বৌদ্ধ ধর্মে অহিংসার শিক্ষা আছে,মৈত্রীর শিক্ষা আছে। আমরা জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করি।

আজ সেই সহিংসতার ৪র্থ বছর:

রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের উদ্যোগে ২৯ শে সেপ্টেম্বর স্মরন পরিষদ২০১৬ এর নানান আয়োজনের মধ্যদিয়ে স্মরণ করা হলো রামু সহিংসতার চার বছর।

রামু লালচিং-মৈত্রী সাদাচিং এ বুদ্ধের সামনে অর্ঘ্যদানের মধ্যদিয়ে শুরু হয় দিনব্যাপী আয়োজন। দিনের অন্যান্য কর্মসুচীর মধ্যে ছিল মহা সংঘদান ও অষ্ট উপকরণ দান।আর জ্ঞাতিভোজন।

এতে সভাপতিত্ব করেন,বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার উপসংঘরাজ ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের। প্রধান ধর্মদেশক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ভাষা পালি বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. জিনবোধি মহাথের। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ড. ধর্মসেন মহাথের উপস্থিত থাকার কথা থাকলে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি।

ধর্মসভায় অন্যান্যদের মধ্যে,শ্রীকুল রাখাইন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ পাঞাদ্বীপা মহাথের, দ্বীপ শ্রীকুল ধর্মরত্ন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উপাঞাচারা মহাথের,রামু মৈত্রী বিহারের অধ্যক্ষ প্রজ্ঞাতিলোক মহাথের, হাজারীকুল বোধিরত্ন বৌদ্ধ বিহারের প্রজ্ঞাবোধি থের,রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ জ্যোতিসেন থের প্রমুখ ধর্ম দেশনা করেন।

রামু সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন, রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের আহ্বায়ক রজত বড়ুয়া রিকু শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন স্মরণ সভা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রিটন বড়ুয়া(এমইউপি)সাধারন সম্পাদক পূর্ণধন বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে শতাধিক বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শ্রামন এবং হাজারো বৌদ্ধ উপাসক-উপাসিকা অংশ নেন।

এর পর দুপুরে রামু সহিংসতার স্মরণে বের হয় মৈত্রী শোভা যাত্রা।

আর এতেই অায়োজনের অংশে আয়োজক হিসেবে ও  ছিল রামুর বৌদ্ধ ছাত্র সংগঠন “বৌদ্ধ মৈত্রী ছাত্র সংসদ “ও তাদের অঙ্গসংগঠন “ত্রিরত্ন মহিলা সমিতি”এর সদস্যারা। সকাল থেকে নানা সহায়তা করে,শান্তি শোভা যাত্রার সহ সন্ধ্যায় জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনায় হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং সর্বশেষে ২৯ শে সেপ্টেম্বর রামুর সেই সহিংসতার কালো রাতের হামলার ভিডিও চিত্র প্রদর্শনী এর মধ্য দিয়ে রামু সহিংসতার ৪র্থ বর্ষ এর স্মরন সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন বৌদ্ধ মৈত্রী ছাত্র সংসদ।

  • লেখক:সাধারন সম্পাদক – বৌদ্ধ মৈত্রী ছাত্র সংসদ
Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=2662

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Sep 30 2016. Filed under মুক্তমত. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

কাতালগঞ্জ নবপন্ডিত বিহার আধুনিকায়ন ও সংলগ্ন সড়কটি বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর নামকরণ করা হবেঃ মেয়র

কাতালগঞ্জ নবপন্ডিত বিহার আধুনিকায়ন ও সংলগ্ন সড়কটি বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর নামকরণ করা হবেঃ মেয়র

সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, চকবাজার কাতালগঞ্জস্থ নবপন্ডিত বিহারের আধুনিকায়নে আমার পক্ষ থেকে সব ধরণের সহযোগিতা থাকবে। বিহারের অবকাঠামো উন্নয়নে যা যা করা প্রয়োজন আমি সার্বিক সহায়তা প্রদান করবো। তাছাড়া বিহার সংলগ্ন সড়কটি বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর নামে নামকরণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আমি […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।