কোশল রাজ রাজা প্রসেনজিত

Smiley face

রাজা প্রসেনজিত ছিলেন কোশলের রাজা।শ্রাবস্তী ছিল কোশলের রাজধানী এবং খুবই সমৃদ্ধশালী নগরী।শ্রাবস্তীতে বুদ্ধ অনেক ধর্মোপদেশ দান করেছেন।এখানে তাঁর জীবনের অনেক স্মৃতি বিজড়িত আছে।তাই শ্রাবস্তী বৌদ্ধদের একটি প্রধান তীর্থস্থান।এর বর্তমান নাম সাহেত-মাহেত।এটি বর্তমানে ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত।প্রজেনজিত ছিলেন কোশলের রাজা মহাকোশলের পুত্র এবং বুদ্ধের সমসাময়িক।তিনি তক্ষশিলায় লেখাপড়া করেন।লিচ্ছবি মহালি এবং মল্ল রাজপুত্র ভণ্ডুল ছিলেন তাঁর সহপাঠী।তিনি বিভিন্ন রকম বিদ্যা ও শিল্পকলা শিখে তক্ষশিলা থেকে ফিরে আসেন।পিতা মহাকোশল বিদ্যা ও শিল্পকলায় তাঁর পারদর্শিতা দেখে খুবই সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে কোশলের সিংহাসনে অধিকারী করান।রাজ্যভার গ্রহণ করে তিনি খুবই নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে রাজ্য শাসন করতেন।তিনি জ্ঞানী ও সাধু ব্যক্তি ব্যক্তিদের খুব ভালোবাসতেন এবং তাঁদের সঙ্গ উপভোগ করতেন।বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভের পরপরই রাজা প্রসেনজিত বুদ্ধের অনুসারী হন এবং মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি ‍বুদ্ধের উপাসক হয়ে জীবন অতিবাহিত করেন।

বুদ্ধের অনুসারী হলেও রাজা প্রসেনজিত অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতি ছিলেন সহানুভূতিশীল।জানা যায় তিনি একবার মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন কিন্তু বুদ্ধের উপদেশে তিনি যজ্ঞে বলি প্রদানের জন্য সে সকল পশু যোগাড় করা হয়েছিল সে সকল পশুকে মুক্তি দেন এবং পরবর্তীকালে যজ্ঞ ও পশুবলি পরিত্যাগ করেন।তিনি প্রায় সময় বুদ্ধের নিকট গমন করতেন এবং অনেক বিষয়ে বুদ্ধের উপদেশ গ্রহণ করতেন।ত্রিপিটকের অন্তর্গত সংযুক্ত নিকায়ে কোশল সংযুক্ত নামে একটি অধ্যায় আছে, সেখানে কোশলরাজ প্রসেনজিতকে উদ্দেশ্য করে বুদ্ধের অনেক উপদেশ্য পাওয়া যায়।এক সময় বুদ্ধ তাঁকে সীমিত আহারের উপদেশ দেন।তিনি বুদ্ধের উপদেশ পালন করে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হন।

মল্লিকাদেবী ছিলেন কোশলরাজ প্রসেনজিতের স্ত্রী।তিনি এক উদ্যান পালকের কন্যা ছিলেন।কিন্তু তিনি খুবই বুদ্ধিমতি ছিলেন।রাজা তাঁকে খুব ভালোবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন।যে-কোনো বিষয়ে তাঁর উপদেশ গ্রহণ করতেন।একদিন তিনি রানিকে জিজ্ঞাসা করলেন, রানি!তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাস?তিনি উত্তরে বললেন, পৃথিবীতে নিজের চেয়ে আপন কেউ নেই।রানি খুবই ধার্মিক ছিলেন।তাই তিনি সত্য কথা বললেন।রাজা্ একথা বুদ্ধকে জ্ঞাত করলে বুদ্ধ মল্লিকার কথ সত্য বলে সমর্থন করেন।বিবাহের পর মল্লিকা এক কন্যাসন্তান প্রসব করেন।কন্যাসন্তান জন্মের কারণে রাজা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলে বুদ্ধ বলেন, শিক্ষা-দীক্ষায় উপযুক্ত করে তুলতে পারলে নারীরাও পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে, সুন্দরভাবে রাজ্যশাসন করতে পারে।

রাজা প্রসেনজিত বুদ্ধকে এতই শ্রদ্ধা করতেন যে, বুদ্ধের বংশের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি করার জন্য তিনি খুবই উদ্বগ্রীব ছিলেন।রাজা প্রসেনজিত সশিষ্য বুদ্ধকে একসপ্তাহের জন্য নিমন্ত্রণ করে উত্তম খাদ্যদ্রব্য দ্বারা আপ্যায়িত করেন।সপ্তম দিবসে তিনি বুদ্ধকে একসপ্তাহের জন্য নিমন্ত্রণ করে উত্তম খাদ্যদ্রব্য দ্বারা আপ্যায়িত করেন।সপ্তম দিবসে তিনি বুদ্ধকে প্রতিদিন তাঁর গৃহে ভোজন গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান।বুদ্ধ অপরাগতা প্রকাশ করে আনন্দকে নিমন্ত্রণ রক্ষার জন্য বলেন।আনন্দ ভিক্ষুসঙ্ঘসহ প্রতিদিন রাজার গৃহে ভোজন গ্রহণ করতে যেতেন।রাজা ব্যস্ত থাকায় তাঁদের পরিচর্যা করতে পারতেন না।ভিক্ষুসঙ্ঘ অবহেলা ভেবে ভোজন গ্রহণ হতে বিরত থাকেন।এতে রাজা প্রসেনজিত অতীব মনোকষ্ট পান।ভিক্ষুসঙ্ঘের সেবা ও বুদ্ধের বংশের সঙ্ঘে আত্মীয়তা করার জন্য শাক্যজাতির কন্যা বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নেন।অতঃপর তিনি শাক্যরাজের কাছে দূত প্রেরণ করেন।সে সময় শাক্যরা নিজ সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কারো সঙ্ঘে বৈবাহিক সম্পর্ক করত না।প্রসেনজিত ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী রাজা।তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে শাক্যদের বিপদ হতে পারে ভেবে তাঁরা বিকল্প ব্যবস্থা করেন।এ সময় শাক্যদের রাজা ছিলেন মহানাম।মহানামের এক কন্যা বাসবক্ষত্রিয়া নাগমুণ্ডা দাসীর গর্ভে জন্মেছিল।তাঁকে তিনি রাজা প্রসেনজিতের সঙ্গে বিয়ে দেন।বাসবক্ষত্রিয়ার এক পুত্র হয়্তার নাম বিড়ুঢ়ভ।বিড়ুঢ়ভ মামাবাড়িতে এসে কখনো মর্যাদা পেতেন না।শাক্যরা একবার বিড়ুঢ়ভকে দাসীর পুত্র বলে অপমান করে।বিড়ুঢ়ভ এতে খুব ক্ষিপ্ত হন।তিনি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকেন।এক সময় কোশলের সেনাপতির সাহায্যে তিনি পিতা রাজা প্রসেনজিতকে সিংহাসনচ্যুত করে রাজ্য ক্ষমতা দখল করেন।প্রসেনজিত শ্রাবস্তীতে পালিয়ে যান।অল্পদিনের মধ্যে তিনি সেখানে মৃত্যু বরণ করেন।তারপর বিড়ুঢ়ভ কপিলাবস্তু আক্রমণ করেন এবং শাক্যদের নির্মূল করেন।কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরার সময় তিনি প্লাবনের জলে পতিত হয়ে সসৈন্যে নিহত হন।

রাজা প্রজেনজিতের সমকালীন প্রাচীন ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মগধরাজ বিম্বিসার, উজ্জয়িনীরাজ প্রদ্যোত, কোশাম্বীরাজ উদয়ন প্রমুখ।রাজা প্রসেনজিত এবং রাজা বিম্বিসার ছিলেন পরস্পর আত্মীয়।বিম্বিসার রাজা প্রসেনজিতের বোন কোশলদেবীকে বিবাহ করেন।রাজা বিম্বিসার উপঢৌকনস্বরূপ রাজা প্রসেনজিতের কাছ হতে কাশী রাজ্য লাভ করেন।কাশী মগধের অন্তর্গত হয়।এতে মগধরাজ-বিম্বিসারের সাথে রাজা প্রসেনজিতের গড়ে ওঠে সৌহাদ্যময় সুসম্পর্ক।বিম্বিসার পুত্র অজাতশত্রু এ সময় রাজকার্যে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তিনি এক সময় অন্যের প্ররোচনায় পিতাকে কারাবন্দি করেন এবং কারাবন্দি অবস্থায় রাজা বিম্বিসারের মুত্যু হয়।এ খবর শুনে রাজা প্রসেনজিত ক্ষুব্ধ হয়ে কাশী রাজ্য ফিরিয়ে নেন।এ কারণে প্রসেনজিতের সঙ্গে অজাতশত্রুর কয়েকবার যুদ্ধ হয়।চতুর্থবারে তিনি অজাতশত্রুকে পরাজিত করতে সমর্থ হন এবং সিংহাসন ত্যাগ না করা পর্যন্ত বন্দি করে রাখেন।পরে তিনি নিজকন্যা বজিরাকে তাঁর সাথে বিবাহ দেন এবং পুনরায় কাশী গ্রাম উপঢৌকন দেন।একথা শুনে বুদ্ধ উপদেশস্বরূপ বলেন, “যে লোক জয় লাভ করে তার শত্রু বাড়ে।যে পরাজিত হয় তার মর্মবেদনা বাড়ে।যে পরাজিত হয় তার মর্মবেদনা বাড়ে।কিন্তু যার জয়-পরাজয় নেই সে সর্বদা শান্তি উপবোগ করতে পারে।”

রাজা প্রসেনজিতের বোন সুমনা সঙ্ঘে প্রবেশ করে ভিক্ষুণী হন এবং বুদ্ধের ধর্মোপদেশ শ্রবণ ও অনুসরণ করে অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত হন।রাজা প্রসেনজিত এবং তাঁর স্ত্রী মল্লিকাদেবী বুদ্ধ এবং সঙ্ঘকে দান করতে খুবই ভালোবাসতেন।

প্রসেনজিত শ্রাবস্তীর জেতবনে রাজকারাম বিহার নির্মাণ করান।তাঁর প্রধান মহিষী মল্লিকাদেবীর অনুরোধে এখানে একটি অতিথিশালা নির্মাণ করেন।এটি ‘মল্লিকারাম’ নামে খ্যাত হয়।এখানে বসে বুদ্ধ ধর্মদেশনা করেছিলেন।শ্রাবস্তীর অদূরে একটি গভীর বন ছিল।তার নাম ছিল অঞ্জন বন।রাজা প্রসেনজিত এখানে শিকার করতেন।বুদ্ধের শিষ্য গবস্পতি এখানে বাস করতেন।থেরী সুজাতা এখানে বুদ্ধের ধর্মদেশনা শুনে অর্হত্ব ফল লাভ করেন।রাজা প্রসেনজিত বুদ্ধের ধর্ম শ্রবণের পর হতে প্রাণী হত্যা পরিত্যাগ করেন।

প্রসেনজিত অত্যন্ত দানপরায়ণ ছিলেন।একবার তিনি বুদ্ধকে পাঁচশত শিষ্যসহ জেতবনে নিমন্ত্রণ করেন।তখন তিনি নগরবাসীদের ডেকে বললেন, তোমরা এসে আমার দান দেখ।নগরবাসীরা রাজার দান দেখলেন।তারপর নগরবাসীরা্ও সশিস্য বুদ্ধকে নিমন্ত্রণ করে রাজাকে বললেন, মহারাজ, আপনি আমাদের দান দেখুন।রাজা তাঁদের দান দেখে ভাবলেন প্রজারা আমার চেয়ে অনেক বেশি দান করেছে।আমি আবার মহাদানের ব্যবস্থা করব।এভাবে রাজা ও প্রজাদের মধ্যে দানের প্রতিযোগিতা হয়।প্রতিযোগিতায় রাজা বারাবর পরাজিত হয়ে ভাবলেন, আমি প্রজাদের মতো দান কী কখনো দিতে পারব না?

রানি মল্লিকা এই বিষয়ে জানতে পেরে একটি মহাদানের আয়োজন করেন।সেই দানানুষ্ঠানে রাজা নিজের হাতে ভিক্ষুসঙ্ঘকে দান করলেন।এ মহাদানে প্রায় চৌদ্দ কোটি মুদ্রা ব্যয় হয়েছিল।বুদ্ধকে বন্দনা করে তিনি বললেন, ভন্তে, আমার এই দানে আপনাদের ব্যবহারের যাবতীয় উপকরণ আছে।রাজা আরও বললেন, যুদ্ধ ও রাজ্যবিস্তারে আমি এখন আনন্দ লাভ করি না।আমি সুখে শান্তিতে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে চাই।উত্তরে বুদ্ধ বলেছিলেন দানে দ্রব্য সম্ভারের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ নয়।চিত্তের একাগ্রতা ও শ্রদ্ধা ভক্তি হলো মূল।পরিবর্তীতে বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসার, বুদ্ধও ভিক্ষুসঙ্ঘের সেবা, সুশাসন এবং মহতী দানকর্মের জন্য রাজা প্রসেনজিত এবং রানি মল্লিকাদেবী বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=5715

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Apr 23 2017. Filed under জীবনী, প্রবন্ধ. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।