গৌতম বুদ্ধের বোধিসত্ত্ব জীবনে সমাজ কর্মে মৈত্রী অনুশীলন

Smiley face

গৌতম বুদ্ধ জন্ম-জন্মান্তরে নৈতিক জীবনযাপন করেছেন। কোনো বাধা-বিঘ্নই তাঁকে নৈতিকতার আদর্শ হতে চ্যুত করতে পারেনি। বুদ্ধত্ব লাভের পূর্বে তিনি বোধিসত্ত্ব অবস্থায়ও নৈতিক জীবনযাপন করে মানবিক কর্ম সম্পাদন করতেন। এরূপ একটি অতীত জীবন কাহিনী থেকে জানা যায়।

অতীতে বোধিসত্ত্ব মগধ রাজ্যের মচল গ্রামের এক মহাকুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নাম ছিল মঘ কুমার। বড় হলে লোকে তাঁকে ‘মঘ মানবক’ নামে ডাকত। মচল গ্রামে সে সময় ত্রিশ ঘর লোক বাস করত। মঘ মানবক গ্রামবাসীর কল্যাণে সর্বদা নিয়োজিত থাকতেন। সেই গ্রামের যুবকগণ হত্যা, চুরি, মিথ্যাচার, ব্যভিচার, নেশাদ্রব্য সেবক প্রভৃতি অপকর্মে লিপ্ত ছিল। মঘ মানবক তাদের কুশলকর্ম করার জন্য সংগঠিত করেন। এদের নিয়ে তিনি গ্রামের রাস্তাঘাট নির্মাণ, মেরামত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতেন। সেতু নির্মাণ করতেন। রাস্তার খাদে আটকে যাওয়া গাড়ির চাকা ওঠাতে সাহায্য করতেন। পুষ্করিণী খনন, বৃক্ষরোপণ, জমিচাষের জন্য জলাধার ও ধর্মশালা নির্মাণ প্রভৃতি জনহিতকর কাজ করতেন।

buddha-times

এবং গ্রামের প্রতিটি ঘরের প্রবেশ পথে লিখে দিলেন ৭টি নীতি। এই সাতটি নীতি হলো:-

১। আজীবন পিতা-মাতাকে সেবা-যত্ন করবে, ২। অন্যান্য গুরুজন যাঁরা আছেন; বযসে বড় জ্ঞানে বড়, পদে বড়; তাদের শ্রদ্ধা করবে, ৩। পরস্পর মধুর সম্ভাষণ করবে, ৪। কোনদিনও পিসুন বাক্য বলবে না। অর্থাৎ ভিতরে ভিতরে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়ার কথা বলবে না, ৫। সম্যক জীবিকা দ্বারা যা অর্জন করবে তা থেকে যথাসাধ্য দান করবে, ৬।কখনও মিথ্যা কথা বলে একে অন্যকে ঠকাবে না, ৭। কোন কারণে একে অন্যের প্রতি ক্রোধান্বিত হতে পারবে না। রাগ করতে পারবে না। যদি কোন কারণে একে অন্যের প্রতি রাগও করে থাকে; সাথে সাথে “মৈত্রী” দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলতে হবে।

এই নিয়মে নীতি প্রতিপালন ও দানাদি পুণ্যকর্ম সম্পাদন করে যুবকগণ বোধিসত্ত্বের উপদেশমতো সকল প্রকার অকুশকর্ম পরিত্যাগ করে পঞ্চশীল পালন করতে শুরু করেন। ফলে গ্রামে হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যাচার, নেশা সেবন ইত্যাদি অপরাধ বন্ধ হয়ে যায়। তখন গ্রামের গ্রাম প্রধান ভাবলেন, ‘আগে যুবকেরা নেশা খেয়ে মারামারি, কাটাকাটি করত। এতে নেশাদ্রব্যের ব্যবসা এবং জরিমানা দ্বারা আমার অনেক আয় রোজগার হতো। এখন বোধিসত্ত্বের নৈতিক শিক্ষার কারণে আমার আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেল।’ এরুপ ভেবে তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প করলেন।

একদিন গ্রামপ্রধান রাজার কাছে গেলেন। তিনি বোধিসত্ত্ব ও যুবকদের বিরুদ্ধে রাজার নিকট নালিশ করলেন, ‘মহারাজ! গ্রামে একদল ডাকাত জুটেছে; তারা লুটপাট ও নানা উপদ্রব করে বেড়াচ্ছে।’ রাজা গ্রামপ্রধানের কথা শুনে তাদের ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। রাজার আদেশে প্রহরীগণ বোধিসত্ত্ব ও যুবকদের বন্দী করে আনল। রাজা তাদের কোনা কথা না শুনেই হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে মারার নির্দেশ দিলেন। প্রহরীরা বন্দীদের রাজপ্রাসাদের সামনে রাস্তায় হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে হাতি আনতে গেল। তখন বোধিসত্ত্ব তাঁর সঙ্গীদের বলতে লাগলেন, ‘ভাইগণ! শীলগুণ স্মরণ করে মৈত্রী ভাবনা কর। গ্রামপ্রধান, রাজা ও হস্তী কারও প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়ো না, সকলেই আমাদের প্রিয়জন।’ এদিকে তাঁদের পিষ্ট করার জন্য হাতি আনা হলো। কিন্তু মাহুত বারবার চেষ্টা করেও হাতিকে বন্দীদের কাছে নিয়ে যেতে পারল না। হাতি বন্দীদের দেখামাত্র বিকট শব্দ করতে করতে পালিয়ে গেল। তাদের হত্যা করার জন্য আরও হাতি আনা হলো। সেই হাতিগুলোও একইভাবে পালিয়ে গেল। রাজা ভাবলেন, নিশ্চয়ই বন্দীদের কাছে এমন কোনো ঔষধ আছে যার জন্য হাতিগুলো কাছে যেতে পারছে না। কিন্তু অনুসন্ধান করে তাদের নিকট কোনো ঔষধ পাওয়া গেল না।

তখন রাজার মনে হলো তারা মন্ত্র প্রয়োগ করছে। অতঃপর রাজা তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি কোনো মন্ত্র প্রয়োগ করছ? বোধিসত্ত্ব বললেন, হ্যাঁ মহারাজ! আমরা মন্ত্র প্রয়োগ করছি বটে। রাজা মন্ত্র জানতে চাইলে বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘আমরা অন্য কোনো মন্ত্র জানি না। তবে আমরা প্রাণি হত্যা করিনা। চুরি করি না। কুপথে চলি না। মিথ্যা বলি না। সুরাপান করি না। জনহিতকর কাজ করি। সকলের প্রতি মৈত্রী প্রদর্শন করি। যথাসাধ্য দান করি। পুষ্করিণি খনন করি। ধর্মশালা নির্মাণ করি। এরূপ নানা জনহিতকর কাজ করি। অপরের ক্ষতি হয় এরূপ কাজ করি না। অপরকে কষ্ট দিই না। এই আমাদের মন্ত্র। এই আমাদের শক্তি। মৈত্রী ভাবনা আমাদের মূল মন্ত্র।’

এ কথা শুনে রাজা খুবই প্রসন্ন হলেন। তিনি বোধিসত্ত্ব ও যুবকদের নৈতিক ও জনহিতকর কাজের প্রশংসা করে পুরষ্কৃত করলেন।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=2178

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Jul 2 2016. Filed under জীবন চর্চা, বৌদ্ধধর্ম. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।