বুদ্ধের জীবন পর্যালোচনা:

গৌতম বুদ্ধের সাম্যনীতির প্রয়োগ এবং এর সামাজিক প্রভাব

Smiley face

বুদ্ধের সমকালীন সমাজে নিম্নশ্রেণির মানুষের কোনো সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার ছিল না। বুদ্ধ অবহেলিত নিম্নশ্রেণির মানুষকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভিক্ষুসঙ্ঘে প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন। সে সময়ে সমাজে নিম্নশ্রেণির মানুষের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, ধর্ম ও অন্যান্য বিদ্যা শিক্ষায় বিধি-নিষেধ ছিল। বুদ্ধ সঙ্ঘ প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে ধর্ম ও বিদ্যা চর্চায় তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। এমনি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত  প্রথমেই বলা চলে রাজগৃহের রাজপথের ঝাড়ুদার সুণীতের জীবনী। বুদ্ধ সুনীতকে তাঁর সুমহান সংঘের স্থান দিয়ে জগতের সাম্যনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আজ এই নিবন্ধে জানবো গৌতম বুদ্ধের জীবনে সাম্যনীতির প্রয়োগের ইতিহাস।

বুদ্ধের সময়কালে রাজগৃহের একপ্রান্তে এক অস্পৃশ্য দরিদ্র ধাঙর (মেথর) পরিবার বাস করত। সেই পরিবারে সুনীত নামক এক ছেলে ছিল। বড় হয়ে সেও জাতের পেশা গ্রহণ করে। রাজপথ ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করা, ময়লা-আবর্জনা নগরের বাইরে নিক্ষেপ করা প্রভৃতি ছিল তার নিত্য কাজ। এ কাজে কটুক্তি ও তিরস্কার ছিল তার নিত্য পাওনা। অস্পৃশ্য বলে তাচ্ছিল্য, অবহেলা ও অনাদরে তার দিন কাটত। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে সে গ্লানিময় জীবনের কথা ভাবত।

buddha and sunita

বুদ্ধ ও রাজ গৃহের ঝাড়ুদার সুনীত।

একদিন সে ঝুঁড়িভর্তি আবর্জনা নিয়ে পথ চলছিল। তখন সে পথে সশিষ্য বুদ্ধ নগরে আসছিলেন। বুদ্ধ কাছাকাছি এলে সে আবর্জানার ঝুঁড়ি নামিয়ে সকলের ছোঁয়া এড়িয়ে কুণ্ঠিতভাবে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।

মনে মনে ভাবছিল, আহা! আমি যদি ভগবান বুদ্ধের পদতলে ঠাঁই পেতাম! বুদ্ধ তার মনোবাসনা জানতে পেরে তার সামনে এসে মৈত্রীময় দৃষ্টিতে তাকালেন। বুদ্ধ তার মাথায় হাত রেখে বলরেন, এসো সুনীত! আমার সঙ্গে বিহারে চলো। সুনীত বিস্ময়ে হতবাক হলো। সে ভাবল, ‘আমি রাস্তার ঝাড়ুদার, সবার অবজ্ঞার পাত্র। কিন্তু সর্বজন পূজ্য ভগবান বুদ্ধ আমাকে স্পর্শ করে স্নেহজড়িত কণ্ঠে আহ্বান করলেন।’ সে আবেগ-বিহ্বল হয়ে বুদ্ধের চরণে লুটিযে পড়ল। অতঃপর বুদ্ধ তাকে বিহারে নিয়ে দীক্ষা দেন এবং ভিক্ষুসংঘে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। সংঘে প্রবেশ করে অল্পকালের মধ্যে সুনীত সর্ব আসক্তি ক্ষয় করে অর্হত্ব লাভ করেন।

বুদ্ধের জীবনী পর্যালোচনায় এমন আরো অনেক ঘটনা জানা যায়। যা থেকে জানা যায় , সুনীতের মতো অনেকে বুদ্ধের সঙ্ঘে প্রবেশ করে মানব জীবনকে ধন্য করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যেমন: উপালী ছিলেন নাপিতপুত্র। তিনি সঙ্ঘে প্রবেশ করে বুদ্ধের অন্যতম শিষ্যে পরিণত হন এবং বিনয়ে পারদর্শীতা অর্জন করে বুদ্ধ কর্তৃক বিনযধর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। তিনি বিনয় সম্পর্কিত বুদ্ধের সকল দেশনা স্মৃতিতে ধারণ করে রেখেছিলেন। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তিনি প্রথম মহাসঙ্গীতিতে বুদ্ধ দেশিত  বিনয় সমূহ আবৃত্তি করেন, যা বিনয় পিটকে সংকলিত আছে।

এভাবে বুদ্ধ সকল পেশার মানুষকে সঙ্ঘে প্রবেশ ও ধর্ম চর্চার অধিকার দিয়ে মনুষ্যত্বের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। জন্ম ও জীবিকার কারণে মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার প্রচলিত প্রথা বুদ্ধ মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলেন।

জাতিভেদ প্রথা ও বর্ণবৈষম্য বিলোপ সাধনের অনেক উদাহরণ বুদ্ধের জীবনচরিতে পাওয়া যায়। বুদ্ধের ধর্মে সর্বস্তরের মানুষ স্থান লাভ করেছে। তাদের মধ্যে যেমন, কুল্ল স্থবির ছিলেন কৃষক। যশ স্থবির ছিলেন মালীর পুত্র। হিরণ্যক স্থবির ছিলেন এক চোরের পুত্র। ছন্ন বা ছন্দক ছিলেন দাসীর পুত্র। গণিকা আম্রপিালির পুত্র ছিলেন বিমর স্তবির। এ ধরনের আরো অনেক সাধারন ঘরের মানুষ বুদ্ধের শিষ্য হয়ে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলনে জীবনে পরম লক্ষ্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বুদ্ধের সময়কালে নারী স্বাধীনভাবে ধর্ম ও বিদ্যা চর্চা করতে পারতেন না। বুদ্ধ ভিক্ষুণীসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করে ধর্ম ও শাস্ত্র অধ্যয়নে নারীদের সুযোগ করে দেন। ত্রিপিটকে, বিশেষত থেরীগাথা গ্রন্থে অনেক নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁরা ধর্ম ও বিদ্যা চর্চায় পারদর্শীতা ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

থেরীগাথা পাঠে জানা যায় যে, সুমঙ্গলের মা দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ধ্যান সাধনা করে তার মনের রিপুসমূহ সংযত করে অর্হত্ব ফল লাভ করেছিলেন। বৈশালী নগরীর গণিকার কন্যা বিমলা একদিন মৌদগল্যায়ন স্থবিরের উপদেশে ভিক্ষুণী হন। পরে তিনি কঠোর সাধনার মাধ্যমে অর্হত্ব ফল রাভ করেন। এভাবে ব্যাধের মেয়ে চাঁপা, শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিকের দাসী পূর্ণিকা, স্বর্ণকারের কন্যা শুভা, দরিদ্র পরিবারের মেয়ে কৃশা গৌতমী বুদ্ধের ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গভীর সাধনার মধ্য দিয়ে অর্হত্ব ফল লাভ করতে সক্ষম হন।

তাছাড়া তাঁর ধর্মে রাজা, মহারাজা, রানি, রাজকন্যা, শ্রেষ্ঠী কন্যাও স্থান পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শাক্যরাজ শুদ্ধোদনের মহিষী মহাপ্রজাপতি গৌতমী, মহারাজ বিম্বিসারের রানি ক্ষেমা, কোশলের মহারাজার বোন সুমনা অন্যতম। ভিক্ষুণীদের মধ্যে অনেকেই ধর্ম ও দর্শন চর্চায় সুপণ্ডিত ছিলেন। ধর্ম দেশনায়, বিনয়কর্ম সম্পাদনে এবং শাস্ত্র অধ্যয়নে তাঁরা ভিক্ষুদের সমকক্ষ হতে পেরেছিলেন।

সাম্যনীতির সামাজিক প্রভাবঃ

সমাজ জীবনে বুদ্ধের সাম্যনীতির অশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত এবং গৌতম বুদ্ধ হলেন সাম্যনীতির প্রবক্তা। সাম্যনীতি শব্দটি ‘সাম্য’ ও ‘নীতি’ শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। সাম্যনীতি বলতে বৈষম্যহীনতা, ন্যায় বিচার, মৌলিক অধিকার, পারস্পরিক মর্যাদাবোধ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা বোঝায়। সাম্যনীতি হচ্ছে সর্বাধিক গ্রহযোগ্য নীতি যার মাধ্যমে সর্বপ্রকার বৈষম্য দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বুদ্ধের ধর্মে এ নীতির বহুল প্রয়োগ দেখা যায়। বুদ্ধ তাঁর সংঘ পরিচালনায় সাম্যনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ন্যায় বিচার ব্যতীত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি সাম্যনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে বিরাজমান বৈষম্যগুলো দূর করতে চেষ্টা করেছিলেন।

বুদ্ধের সময়কালে তথাকথিত নিম্নবর্ণ হিসেবে সমাজে যারা অবহেলিত, নিগৃহীত, নিষ্পেষিত ও ঘৃণিত ছিল তারা বুদ্ধের সাম্যনীতির প্রভাবে আত্ম-মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রেরণা লাভ করেছিল। বুদ্ধের সাম্যনীতি প্রমাণ করেছে যে, পেশাগত দক্ষতা ও মেধার মাধ্যমে সমাজে যে কেউ প্রতিষ্ঠা ও সুখ্যাতি লাভ করতে পারে। এই সত্যটি উপলব্ধি করে সেদিন জন্মগত কারণে অবহেলিত মানুষগুলো কর্মের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। বুদ্ধের সাম্যনীতির ফলে ধর্ম ও বিদ্যা চর্চায় নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং নারীদের মুক্ত চিন্তার দ্বার উন্মোচিত হয়।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটেও বুদ্ধের সাম্যনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বুদ্ধের সাম্যনীতি অনুশীলনের মাধ্যমে:১। জাতিগত বিদ্বেষ দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।২। সকলের মৌলিক নিশ্চিত করা যেতে পারে। ৩। পরধর্ম ও পরমতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের মনোভাব সৃষ্টি করা যেতে পারে। ৪। পেশা ও শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। ৫। নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ৬। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। ৭। পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিরাজমান সকল বৈষম্য দূর করা যেতে পারে।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=6685

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Nov 6 2017. Filed under প্রবন্ধ, বৌদ্ধধর্ম. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।