৬ষ্ঠ সংগীতিকারক প্রজ্ঞালোক মহাস্থবিরের আহ্বান:

জাগ্রত হও!

Smiley face
প্রজ্ঞালোক
৬ষ্ঠ সংগীতিকারক প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির। ছবি: অনলাইন।

৬ষ্ঠ সংগীতিকারক প্রজ্ঞালোক মহাস্থবিরঃ  তরুন ভিক্ষুরা বাঙ্গালা, ইংরেজী সংস্কৃত, পালি ও হিন্দী এই পাঁচটি ভাষায় যেখানে যেখানে দক্ষতা লাভ করিতে পারা যায়, তথায় গমন করুন। *•যদি চিন্তা করি ভিক্ষু ও গৃহীদের মধ্যে যে কয়েকজন মহাপুরুষ মারা গেলেন তাহা স্থান পূর্ণ করিবার কেহ আছেন কি? আমাদের এই গৌরব, এই কীর্তি, এই প্রতিষ্ঠান কি কেবল মুখের জোরে বজায় থাকিবে?

করোন্তো ধম্মদূতেয্যং বিক্খ্যাপয়ত্থ ভিক্খবো,

সন্তি অত্থায় সত্তানং সুব্বতা বচনং মম।

শ্রী শ্রী সম্যক্ সম্বুদ্ধ দেশিত সদ্ধর্মের সুপ্রচার মানসে এই বৌদ্ধ মিশন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। বোধিসত্ত্ব বুদ্ধত্ত্ব লাভ করিয়া ভিক্ষুদিগকে আদেশ করিলেন যে- হে ভিক্ষুগণ! তোমরা দেশ দেশান্তর যাইয়া আমার প্রবর্তিত সদ্ধর্ম বাণী জনসমাজে ঘোষণা কর। যাহাতে বহু দেব মনুষ্যের হিত সুখ সাধিত হয়। কিন্তু এক রাস্তা দিয়া দুইজন যাইও না। বুদ্ধের বীর্য্যসূচিত আদেশ পাইয়া বীর্য্যবান, পরহিতৈষী ভিক্ষুগণ সিংহ বিক্রমে দেশ দেশান্তরে ছুটিয়া গেলেন; এবং তথাগত প্রবর্ত্তিত সদ্বর্ম্ম সুপ্রচার করিয়া বহু দেব মনুষ্যকে নির্বাণমৃত প্রদান করিলেন।

বুদ্ধের নির্বাণের ২১৮ বৎসর পরে রাজা ধর্মাশোক মোগ্ললিপুত্ত তিস্স মহাস্থবিরের সাহায্যে ধর্ম প্রচার কার্য্যে মনোনিবেশ করিলেন। এমন কি সুদূর আমেরিকা তিনি প্রচারক পাঠাইয়া শ্রীশ্রী বুদ্ধের নির্বাণ ধর্ম প্রচার করাইয়াছিলেন।

বর্তমান যুগে অনাগারিক মহাত্মা ধর্মপাল লণ্ডন প্রভৃতি রাজ্যে গিয়া ধর্ম প্রচার করিয়াছেন। তাহারই উদ্যেগে লণ্ডনে বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। তথায় তিনজন ভিক্ষু বাস করিতেছেন। শ্রীমৎ বজ্রজ্ঞান ভিক্ষু ফ্রান্সেও ধর্ম প্রচার কার্যে্য মনোযোগী হইয়াছেন।

বার্হ্মাদেশীয় ভিক্ষুরা শ্রাবস্তী, কুশীনগর, রাজগৃহ, বলরামপুর প্রভৃতি স্থানে ধর্মশালা নির্মাণ করিয়া সেই দেশীয় লোকের সঙ্গে ধর্মালাপে মনোযোগী হইয়াছেন।

আর এদিকে চট্টলের ভিক্ষুরা মহাস্থবির কৃপাশরণ প্রতিষ্ঠিত সাধের ধর্ম্মঙ্কুর বিহার, লক্ষৌ বোধিসত্ত্ব বিহার ও দার্জিলীং গন্ধমাদন বিহার রক্ষা করিতে অসমর্থ। প্রচারের কথা ত দূরে।

মহাত্মা ধর্ম্মপাল বিদেশে ধর্ম্মপ্রচারার্থ কবীন্দ্র রবীন্দ্র নাথ প্রতিষ্ঠিত বোলপুর শান্তিনিকেতনে ১০জন ভিক্ষু শ্রামনের পাছাইয়া নানাভাষা শিক্ষার সুযোগ করিয়া দিয়াছেন।

চট্টগ্রামের ভিক্ষুরা ধর্ম বিনয় শিক্ষার জন্যে সিংহলে গমন করেন। সিংহলের ভিক্ষু শ্রামণেরা নানা ভাষা শিক্ষার্থ ভারতে আসিতেছেন। ইহাও চট্টল ভিক্ষুদের চিন্তার বিষয় বটে।

অশোক পুত্র মহিন্দ্র পিতাকে ধর্ম্মদায়াদ করিবার জন্য ভিক্ষু হইলেন। পরে লঙ্কাদ্বীপে ধর্ম্ম প্রচারার্থ গমন করিয়া যখন ১০ হাজার ভিক্ষু লঙ্কাদ্বীপের বিবিধ স্থানে প্রচার কার্যে্য নিয়োগ করিলেন, তখন দেবনামপ্রিয় প্রিয়তিষ্য রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন-

ভান্তে! লঙ্কাদ্বীপে ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে কি?

না রাজন! এখনও হয় নাই।

ভান্তে, কখন হইবে?

যখন লঙ্কাদ্বীপের জাতসন্তান লঙ্কাদ্বীপে উপসম্পন্ন হইয়া লঙ্কাদ্বীপে ধর্ম্মবিনয় শিক্ষা করতঃ লঙ্কাদ্বীপে প্রচারে সমর্থ হইবে তখনই বুদ্ধশাসনে লঙ্কাদ্বীপে সুপ্রতিষ্ঠিত হইবে।

এখন মাননীয় চট্টলের ভিক্ষুগণ চিন্তা করুন- মহাপুরুষের এই বাক্যের সানঞ্জস্যতা চট্টল ভিক্ষুরা কখনও করিতে পারিয়াছেন কি? এখন চট্টগ্রামে সুশিক্ষিত শীলবান ভিক্ষু আছেন, ত্যাগ করিতে সমর্থ এমন মহাপ্রাণ ভিক্ষু আছেন, তথাপি চট্টল ভিক্ষুরা প্রতিযোগিতায় হার মানিতেনছেন কেন?ইহা কি আমাদের দৃঢ়বীর্য্যতার অভাবে নহে? বিদেশীরা ভারতে আসিয়া শিক্ষা কার্যে্য আত্মনিয়োগ করতেছে, আর আমরা যাহা শিখিয়াছি, তাহারা আলোচনা, গবেষনা ও ত্যাগ করিয়া পঙ্গুতুল্য বসিয়া রহিয়াছি এবং অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস হইয়া যাইতেছে। ইহা কি ক্ষোভের বিষয় নহে?

এমন কি চট্টগ্রামের সন্নিকটে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার যে কতগুলি বৌদ্ধ আছে তাহাদিগকেও সদ্ধর্ম্মবাণী শুনাইতেছিনা।

সারা জীবন একটি বিহারে বসিয়া থাকিলে না নিজের অর্থ সাধিত হইল না দেশবাসীর অর্থ সাধিত হইল, তাহও একটু ভাবিবার বিষয় বটে; চট্টলের দায়ক ও চট্টলের ভিক্ষু কতদূর ধর্ম্ম প্রেরণার অনুপ্রাণিত হইয়াছে, তাহা একবার গৃহী ভিক্ষু নির্বিশেষে সূক্ষ্ম চিন্তা করিয়া দেখিবেন কি? কেবল দলে বলে আমাদের মিথ্যা মর্যাদা বজায় রাখিয়া সদ্ধর্মের প্রতিষ্ঠা করিতে পারব কি? ধর্ম্মতঃ চট্টলার বিহার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান বজায় রাখিতে আমরা প্রকৃত উদ্যোগ করি কি?

যদি চিন্তা করি ভিক্ষু ও গৃহীদের মধ্যে যে কয়েকজন মহাপুরুষ মারা গেলেন তাহা স্থান পূর্ণ করিবার কেহ আছেন কি? আমাদের এই গৌরব, এই কীর্তি, এই প্রতিষ্ঠান কি কেবল মুখের জোরে বজায় থাকিবে?

অনেক দেরী হইয়া গিয়াছে- এখন অবসাদ পীড়িত হইয়া থাকিবার সময় নাই। চট্টগ্রামে যত ভিক্ষু আছেন তাহারা সমাজের সুখপাত্র; যদি ইচ্ছা করেন, তাহারা আরামে আরাম সুখ টুকু ত্যাগ করিয়া দেশ দেশান্তরে প্রচার কার্যে্য মনোনিবেশ করিতে পারেন।

তরুন ভিক্ষুরা বাঙ্গালা, ইংরেজী সংস্কৃত, পালি ও হিন্দী এই পাঁচটি ভাষায় যেখানে যেখানে দক্ষতা লাভ করিতে পারা যায়, তথায় গমন করুন। বর্তমান যুগে কোন সমাজে শুধু পুরোহিত হইয়া বসিয়া থাকিলে সম্মান নাই। বৃথা বিড়ম্বনা ভোগ করিবার জন্য ভিক্ষু জীবনও নহে।

আসুন আত্মপর হিতৈষী ভিক্ষুগণ! আপনাদের কর্ম্মক্ষেত্র আমরা তৈয়ার করিয়াছি, এখন সকলে একযোগে কার্য্য করুন। দেখিবেন- ভারত মণ্ডলে আবার বৌদ্ধ যুগ প্রবাহিত হইবে ও শান্তির অমিয় ধারা প্রবাহিত হইবে।

বৌদ্ধ সমাজের দুরবস্থা দেখিয়া কতিপয় মহাপুরুষগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে কয়েকখানি জাতীয় বিহার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। মৃতু্যর আবর্তে পড়িয়া ধর্ম্মাঙ্কুর হইতে যে তিনজন মহাপুরুষ অন্তর্হিত হইলেন, তাহাদের স্থানে কেহ পদার্পণ না করায় আজ ধর্ম্মাঙ্কুরের কি শোচনীয় অবস্থা। কয়েকজন লোক নিজের ভ্রম বুঝিতে না পারিয়া বিহার খানির অস্তিত্ব লোপ হওয়ার সূচনা করিয়া দিয়াছে। তাহারাও লাজের মুকুট পরিয়া নিজকে সামলাইতে অপারগ হইয়া সরিয়া পড়িয়াছে। এখন ধর্মাঙ্কুরের খোজ খবর লইবার কেহ নাই। তদ্রুপ অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলির এমন শোচনীয় অবস্থা যে আসে নাই বা আসিবেনা এমন নহে। এক সমস্ত দেখিয়া শুনিয়াও যদি সমাজ হিতৈষী ভিক্ষুগণ সাবধান না হন, তাহা হইলে আমাদের ভবিষ্যত অন্ধকার মনে করিতে হইবে।

আবার দেখা যায় চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান গ্রাম গুলিতে এত সংঘর্ষ উঠিয়াছে যে তাহা সামলান দায় হইয়া ভিক্ষুদের উপর গুলি চালাইতে হইয়াছে। বড়ুয়া জাতির ইতিহাস এমন লোমহর্ষকর জঘন্য ঘটনা আর হইয়াছে কি? যাহারা গুলির ধাক্কা সামলাইয়া এখনও সমাজ রক্ষার জন্যে যে অবৈধ চেষ্টা করিতেছেন, তাহাদের উদ্দেশ্য বুঝাও দায় হইয়াছে।

তাই জনৈক সমাজ হিতৈষী যুবক আমাদিগকে লিখিয়াছিলেন- আপনারা ভিক্ষু না মহাজন? যেই ভিক্ষুদের টাকা পয়সা গ্রহন ও স্পর্শ নিষেধ তাহাদের আবার সুদের দরকার কি? এই কুপ্রথা সমাজে যেরূপ প্রবলবেগে বাড়িয়া উঠিতেছে তাহার কোন প্রতিকার আছে কি? ভিক্ষু আবার ব্যক্তিগত জায়গা জমি সম্পত্তি বাড়াইবে কেন? গৃহত্যাগী হইয়া এই কুপ্রথা কেন? ইহা এখন হইতে নিবারণ না করিলে ভিক্ষুদের অবস্থাও সমাজের অবস্থা কত যে জটিল সমস্যা হইয়া পড়িবে, তাহা হিতৈষীগণের বিশেষরূপে বিবেচ্য।

বড়ুয়া সমাজ যেমন সমষ্টিতে অল্প, তেমন ধনে জ্ঞানে গুণে গৌরবে তত উন্নত বলিয়া বলা যায় না। কারন সমাজে যে কয়েকজন উচ্চ শিক্ষিতের মধ্যে পরিগণিত তাহাদের সমাজ উন্নতির দিকে আদৌ লক্ষ্য নাই।

ধর্ম্মোন্নতি ও শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই পাইয়াছে ও বাদ পড়িয়াছে। এই যে অনর্থক সমস্যা ইহার সমাধান নিরক্ষর ব্যক্তিরা করিতে পারিবে কি?জাতি সমাজের উন্নতি শিক্ষিতের হাতে। তাহাদের অঙ্গুলি সঞ্চালনে দেশ সমাজ সমৃদ্ধ হইয়া উঠে। যদি উচ্চশিক্ষা কেবল নিজের পরিবারের সুখ স্বাচ্ছন্দে্যর জন্য সীমাবদ্ধ হয়, তাহা হইলে উচ্চ শিক্ষার মূল নিশ্চয় কুঠারাঘাত হইবে। এই শিক্ষা লোকের আদর্শ না হইয়া ভীতি সঞ্চার করিবে মাত্র।

ভিক্ষুগণ সমাজে যাহারা শিক্ষিত তাহাদের পুরোহিত স্থান অলংকৃত করা শাসন সমাজের অনুন্নতির মূল। বর্তমান সমাজ ২০ বৎসরের আগের সমাজের চেয়ে সম্পূর্ণ পৃথক। দেশ কাল ভেদে উন্নত জাতির দিকে, নজর করিয়া নিজের অভাব অভিযোগের প্রতি লক্ষ্য করিতে হইবে। জীবন্মৃত হইয়া বাস

করিবার যুগ এখন নহে। প্রত্যক সমাজের হাল চাল এখন বদলাইয়া উঠিয়াছে। আমাদের মুরব্বিদিগের পন্থা আওড়াইয়া থাকিলে সময়ে সময়ে যে গলদ আসিয়া পড়ে, তাহা দেখিয়াও যে আমরা দেখিনা, তাহা বিস্ময়কর বটে।

বর্তমান জগতে যে কোন জাতিতে সঙ্ঘবদ্ধ হইয়া কার্য করিবার জন্য এক একটি মিশন গঠিত হইয়াছে। সেই মিশন প্রভাবে বহু সৎপ্রতিষ্ঠানের সূচনা হইয়াছে। আমরাও ভারত মণ্ডলে সদ্ধর্মের মহা আন্দোলন তুলিয়া দুঃখ বিনাশের পন্থার সূচনা করিতে বৌদ্ধ মিশন গঠন করিয়াছি।

কি ভিক্ষু কি গৃহী সকলে একবার বৌদ্ধ মিশন সম্বদ্ধে আলোচনা করিতে আমরা অনুরোধ করি। দেখিবেন এই বৌদ্ধ মিশনের প্রভাবে সকলের মনে একটি জীবন শক্তির প্রভা ছুটিয়া আসিবে। আমাদের মন আছে, প্রাণ আছে, শক্তি আছে, কেবল আমাদের প্রচেষ্টা থাকিলে নিশ্চয় আমরা কার্য্য করিতে পারিব। সকলে এই আশাটুকু হৃদয়ে স্থান দিন।

আমরা এই মহৎ প্রতিষ্ঠানে সকল তরুন ভিক্ষু ও তরুন যুবকদিগকে বিশেষ উদ্যেগ করিতে অনুরোধ করি। একবার আদর্শ জাতির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন। ত্রিরত্নের জয়গানে ধরণী মুখরিত করিতে সকলে জাগ্রত হউন।

  • -প্রকাশ- সঙ্ঘ শক্তি, বৌদ্ধ মিশন প্রেস, পৌষ পূর্ণিমা, ২৪৭৬ বুদ্ধাব্দ।
  • বৌদ্ধমিশন প্রেস হতে প্রকাশিত মূল “সঙ্ঘশক্তি” পত্রিকা হতে হুবাহু কম্পোজ করেছেন সংগ্রাহক নশ্বর সুজয়।
Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Recommended For You

Leave a Reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।