Mar 9, 2016
27 Views
0 0

জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে চাকমা, মার্মা, বৌদ্ধধর্ম ও গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে অদ্ভুত ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য উপস্থাপনা প্রসঙ্গে

লিখেছেন:

শুভ্র জ্যোতি চাকমাঃ বাঁশ কোড়ল একটি জাতিসত্তার প্রিয় খাদ্য(খাদ্য না লিখে শব্দটি হতে পারত তরকারি) হতে পারে না। হতে পারে প্রিয় তরকারি। কিন্তু প্রিয় খাদ্য উল্লেখ করে কি বোঝানো হয়েছে যে, ঐ জাতিসত্তার লোকেরা শুধুমাত্র বাঁশ কোড়ল(বাঁশের ডগা) খেয়ে জীবনধারণ করে? এ উদ্ভট তথ্যগুলো যখন ভিন্ন জাতিসত্তার কোমলমতি শিশুরা ধারণ করবে তখন ঐ জাতিসত্তার মানুষকে দেখলে স্বাভাবিকভাবে তাদের মনে আলাদা কৌতূহল সৃষ্টি হবে। প্রথম দেখাতে এক পলকে তাকিয়ে থাকবে। তখন ঐ জাতিসত্তা নিজেকে চিড়িয়াখানার কোনো প্রাণি মনে করতে পারে এবং তার মনে স্বাভাবিকভাবে বিরূপ ধারণাও জন্মলাভ করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সরকারি পাঠ্যবই পড়ে যদি শিশুদের কোমল মনোজগতে অবচেতন মনে এ ধরনের অসহিষ্ণু দৃষ্টিভঙ্গি এবং আজগুবি কৌতূহল সৃষ্টি হয় তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি কারোর কাম্যও নয়। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে পাঠ্যবইগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা সংখ্যালঘিষ্ঠ জাতিসত্তাদের বিষয়ে কিছু উদ্ভট, অদ্ভুত তথ্য। যেমন-সপ্তবর্ণা বইয়ে লেখা হয়েছে-মারমারা ভাত, মাছ, শুঁটকি, পশু ও পাখির মাংস খায়। এছাড়া বিভিন্ন বনজ তরি-তরকারিও খেয়ে থাকে।(পৃ-৫৭) ৪র্থ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে মারমাদের প্রধান খাবার সিদ্ধ সবজি ও নাপ্পি প্রিয় খাবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খেয়াল করুন কী অদ্ভুত ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য উপস্থাপনা !

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে দেশে বসবাসকারী সংখ্যালঘিষ্ঠ ১০টি জাতিসত্তা যাদেরকে সরকারি ভাষায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলা হয় তাদের সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য সন্নিবেশিত হচ্ছে। মূলত বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়-এ দু’টো বইয়ে তথ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে কিছু অরুচিকর, উদ্ভট তথ্য এবং দুর্বল লেখনি সেসব মহৎ উপস্থাপনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। অধিকন্তু উপস্থাপনার শৈলী এমন যে যা রীতিমত অপমানজনকও বটে। শিশুতোষ পাঠ্যবইয়ে একটি জাতিসত্তার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি সতর্কতার সাথে উপস্থাপন করা প্রয়োজন রয়েছে যাতে সেসব তথ্যগুলো উপহাসের খোরাক না জোগায়। নচেৎ একটি জাতির সংস্কৃতিকে এভাবে উপস্থাপন না করাই উত্তম।

যে খাবারটির কথা অবতারণা করেছি সেটি উল্লেখ রয়েছে অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে। উক্ত বইয়ে লেখা হয়েছে-তাদের(চাকমা) প্রিয় খাদ্য বাঁশ কোড়ল। বাঁশ কোড়ল দিয়ে চাকমা মেয়েরা বেশ কয়েক ধরনের রান্না ও ভাজি করে।(পৃ-৯৪) দ্বিতীয় বাক্যটি দ্বারা কী বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা একেবারে অস্পষ্ট। উল্লিখিত বাক্যদ্বয় হতে পারত-বাঁশ কোড়ল চাকমাদের সুস্বাদু তরকারি। বাঁশ কোড়ল রান্না ও ভাজি করে খাওয়া যায়। এছাড়াও বাঁশ কোড়ল অন্যান্য তরকারির সাথে মিশিয়ে সুস্বাদু তরকারিও রান্না করা যায়। উল্লিখিত লেখনিতে পরিবেশিত অসত্য তথ্য হচ্ছে-পাড়ার প্রধানকে বলা হয় হেডম্যান। চাকমারা গ্রাম বা পাড়ার প্রধানকে ‘কারবারি’ বলে থাকেন। হেডম্যান বলা হয় মৌজার প্রধানকে। তিনি তাঁর আওতাধীন মৌজার জমির খাজনা গ্রহণ করে থাকেন। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর তেমন ভূমিকা নেই, রয়েছে পাড়া প্রধান কারবারির।

উক্ত বইয়ের ৯৩ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে-এর মধ্যে গৌতম বুদ্ধের জন্ম, মৃত্যু ও বুদ্ধত্বপ্রাপ্তির দিনটি তারা সাড়ম্বরে ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ হিসেবে পালন করে। এ বাক্যটির দ্বারা দিবসটির মর্মার্থ ভালভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এটি হতে পারত-মহামতি গৌতম বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে জন্মগ্রহণ, বোধিজ্ঞান লাভ(বুদ্ধত্ব লাভ) এবং মহাপরিনির্বাণে যান(মৃত্যুবরণ করেন)। এ ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত দিনটি তারা ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ হিসেবে সাড়ম্বরে উদযাপন করে থাকেন। এছাড়া মাঘী পূর্ণিমার রাতে কিয়াং বা প্যাগোডার প্রাঙ্গণে গৌতম বুদ্ধের সম্মানে ফানুস উড়ানোর তথ্যটিও পুরোপুরি সঠিক নয়। এ তথ্যটির দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, চাকমারা শুধুমাত্র মাঘী পূর্ণিমার সময় ফানুস উড়ায়। প্রসঙ্গত যে, চাকমারা সকল ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানে ফানুস উড়িয়ে থাকেন। চাকমাদের সংস্কৃতিতে মৃতদেহ সৎকারে কোনোদিন ‘পোড়ানো’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। ব্যবহৃত হয় ‘দাহ’ শব্দটি। কিন্তু উল্লিখিত লেখনিতে পোড়ানো শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে যা চাকমা সংস্কৃতির পরিপন্থি এবং বেমানান। আমরা কবর দেয়া এবং পুঁতে ফেলা শব্দগুলোর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারলে দাহ এবং পোড়ানো শব্দ দুটির অর্থ সহজে বুঝতে সক্ষম হবো।

সপ্তম শ্রেণির ‘সপ্তবর্ণা’ বইয়ে চাকমা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক এ.কে.শেরাম মৌজা প্রধান হেডম্যান সম্পর্কে লিখেছেন-তিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এবং রাজা কর্তৃক মনোনীত হন। এ তথ্যটিও একবারে মিথ্যা। আসলে চাকমা সমাজের কার্বারী, হেডম্যান এবং রাজার(সার্কেল চিফ) পদবিগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। তবে কার্বারি ও হেডম্যান-এর উপযুক্ত উত্তরাধিকারী না থাকলে সেক্ষেত্রে এলাকার যোগ্যতম ব্যক্তিকে ঐ পদে নিযুক্ত করা হয়। এখানে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। প্রসঙ্গত যে, ৮ম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে পাড়া বা গ্রামের প্রধানকে ‘হেডম্যান’ বলা হয় বলে যে তথ্যটি দেয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল। দু’টি বইয়ে একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রদান কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলবে নিঃসন্দেহে।

চাকমা বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে প্রবন্ধকার বেশ কিছু চাকমা শব্দের বিকৃতিও ঘটিয়েছেন। যেমন-ভতদ্যা(ভাতদ্যা), পাংপূজা(গাংপূজা), গুখি(গুত্থি), মদপিলাল(মদপিলাং), জোড়াবালা (জোড়াবানা) ইত্যাদি। আমাদের কাছে শব্দগুলোর বানান ভুল হয়েছে মনে হলেও ভিন্নভাষী শিক্ষার্থীদের পক্ষে সঠিক শব্দগুলো বোঝা কঠিন হবে। ফলে তারা চাকমা বিষয়ে অনেক ভ্রান্ত তথ্য ধারণ করে বড় হবে। এটি আমাদের জন্য সুখকর হবে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে দেশীয় ভাষার মধ্যে বাংলাভাষার পরে রয়েছে চাকমা ভাষার অবস্থান। তাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্যাবলী তুলে ধরা আমাদের একান্ত কাম্য। এছাড়াও রয়েছে জগাখিচুড়ি তথ্য। যেমন-চুয়ানি। চাকমা ভাষায় চুয়ানি বলতে কোনো জিনিসের নাম বোঝায় না। এটি মদ তৈরি করার প্রক্রিয়া মাত্র। যেমন-মদকে একবার পরিশোধন করলে একচুয়ানি, দু’বার করলে দো-চুয়ানি এবং তিনবার করলে তিনচুয়ানি বলা হয়। অথচ প্রবন্ধকার নিদ্ধিধায় চালিয়ে দিয়েছেন-‘প্রতিবার চুয়ান্ত্ত্তিনিয়ে যেতে হয়’ বলে। প্রবন্ধকার এখনো কিছু কিছু প্রকৃতি পূজা করে বলে উল্লেখ করে চাকমাদেরকে ৫০বৎসর পূর্বের সমাজ ব্যবস্থায় নিয়ে গেছেন। চাকমাদের মধ্যে এখন প্রকৃতি পূজা নেই।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড চাকমা জনগোষ্ঠী বিষয়ে ৪র্থ, ৭ম এবং ৮ম শ্রেণির বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে নানা তথ্য সম্বলিত প্রবন্ধ ছেপেছে। প্রবন্ধগুলোর উপস্থাপনা শৈলী ভিন্ন হলেও তথ্যগুলো প্রায় একই। ফলে ৪র্থ শ্রেণিতে ছাত্র/ছাত্রীরা যে বিষয়ে জেনেছে ৭ম ও ৮ম শ্রেণিতেও তারা একই তথ্যকে জানতে পারছে। এতে চাকমা বিষয়ে তাদের জানার সীমাবদ্ধতা রয়েই যাচ্ছে। অধিকন্তু এসব লেখনির মধ্য দিয়ে এটি সহজ অনুমিত হয় যে, দেশের খ্যাতিমান লেখকগণ এখনো চাকমা সংস্কৃতি ও জীবনপ্রণালী সম্পর্কে ততটা অভিজ্ঞ নন। ফলে বরাবরের ন্যায় প্রতি বৎসর ভ্রান্ত তথ্যগুলো পাঠ্যবইগুলোতে রয়েই যাচ্ছে।

প্রত্যেক জাতির নিজস্ব কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব শব্দ যেগুলো অন্যদের পক্ষে সহজে আয়ত্ত করা কঠিন। আরো কঠিন তাদের সংবেদনশীল সাংস্কৃতিক অনুভূতিগুলো আয়ত্ত করা। আলোচ্য আলোচনায় চাকমা বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হওয়া অসামঞ্জস্য কিছু আজগুবি ও উদ্ভট তথ্য ও শব্দের বিকৃতি এবং অপপ্রয়োগ থেকে আমরা এর সত্যতা পাই। কাজেই এ ধরনের প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী থেকে লেখক অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। না হয় আমরা আমাদের প্রজন্মকে ভুল তথ্যই শিখিয়ে যাব।

যে কোনো বইয়ের তুলনায় পাঠ্যবইগুলো সর্বাধিক পঠিত এবং প্রচারিত। প্রাপ্ত তথ্য মতে, চলতি ২০১৬ শিক্ষাবর্ষে ৪,৪৪,১৬৭২৮ জন শিক্ষার্থীকে ৩৩,৩৭,৬২,৭৬০টি পাঠ্যবই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। (সূত্র: ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, ডেপুটি রেজিস্টার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, দৈনিক জনকণ্ঠ ৩.১.২০১৬) কাজেই এ বিশাল সংখ্যক বইয়ে একটি ভুল থাকা মানে কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে ভুল তথ্য শেখানো।

আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, আগামী ২০১৭ সালের শিক্ষাবর্ষের পূর্বে পাঠ্যপুস্তকে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো সংশোধনের উদ্যোগ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড গ্রহণ করবে। মোট কথা, তথ্য কম হোক কিন্তু আমরা নির্ভুল তথ্যসমৃদ্ধ পাঠ্যপুস্তক প্রত্যাশা করি। যাতে পাঠ্যপুস্তকে এমন কোনো তথ্যের জন্য চাকমা শিশুদেরকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে না হয় এবং তাদেরকে হীনমন্যতায় ভোগায়। কারণ চাকমারা অমুক খায়, সমুক খায়-শুনতে শুনতে খুবই বিরক্ত।

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।
Article Tags:
Article Categories:
মুক্তমত
এক্সিকিউটিভ এডিটর । দি বুড্ডিস্ট টাইমস ডটকম
http://www.thebuddhisttimes.com

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ।

Leave a Comment

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।