দশ পারমী পরিচিতি

Smiley face

বৌদ্ধধর্মে ‘পারমী’ শব্দের অর্থ হচ্ছে  ‘কুশল কর্মেরপূর্ণতা’ বা আরো সাধারণ অর্থে ‘পারমী’ শব্দের অর্থ হলো: পূর্ণতা, সমাপ্তি, সম্পূর্ণতা, প্রকৃষ্ট কৌশল, গুণ, সম্পূর্ণ গুণ বা জ্ঞান, উন্নত অবস্থা, সৎকার্যের পূর্ণতা সাধন, সামর্থ্য, পারমিতা ইত্যাদি।  বৌদ্ধধর্মে পারমীর গুরুত্ব অপরিসীম। বুদ্ধত্ব লাভ বা নির্বাণ লাভ পারমী বিনা সম্ভব নয়। আমরা দেখি গৌতম বুদ্ধ বোধিসত্ত্বরূপে ৫৫০ বার জন্মগ্রহণ করে প্রতিটি জন্মে তিনি পারমী পূর্ণ করে জীবনের উৎকর্ষ সাধনপূর্বক বুদ্ধত্ব লাভের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন।

মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধ ‘পারমী দশ প্রকার’ বলে ভাষণ করেছেন। যা দশ পারমিতা নামেও পরিচিত। যথা:

১) দান পারমী ২) শীল পারমী ৩) নৈষ্ক্রম্য পারমী ৪) প্রজ্ঞা পারমী ৫) বীর্য পারমী ৬) ক্ষান্তি পারমী ৭) সত্য পারমী ৮) অধিষ্ঠান পারমী ৯) মৈত্রী পারমী ১০) উপেক্ষা পারমী।

পারমীসমূহ প্রত্যেকটি তিনটি স্তরে বিভক্ত। যেমন: পারমী,উপপারমী এবং পরমার্থ পারমী। এভাবে পারমী ত্রিশ প্রকার।

দান পারমী : দশ পারমীর মধ্যে দান পারমীর স্থান সর্বাগ্রে। গৌতম বুদ্ধ ‘বুদ্ধত্ব’ লাভের জন্য দশ পারমীর মধ্যে প্রথম ‘দান পারমী’কেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

দান উপ-পারমী :অপরের জীবন রক্ষার্থে নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যেমন, চক্ষু, রক্ত, মাংস প্রভৃতি দান করাকে দান উপ-পারমী বলে। দান পারমী :

দান পরমার্থ পারমী : অপরের সুখ শান্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করাকে পরমার্থ দান বলা হয়। সাধারণত বাহ্যিক বস্তু দান করা সহজ। জীবন দান করা খুবই কঠিন। জন্মজন্মান্তরে বাহ্যিক বস্তু দানের অভ্যাস না থাকলে জীবন উৎসর্গ করা যায় না। বাহ্যিক বস্তু দান অভ্যাস করার পর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও জীবন উৎসর্গ করতে সক্ষম হয়।

শীল পারমী : ‘শীল’ শব্দের অর্থ চরিত্র। তথাগত বুদ্ধ চরিত্রের উৎকর্ষতা সাধনের জন্য যেসব নিয়ম বিধিবদ্ধ করেছেন তা শীল নামে অভিহিত। প্রাণিহত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যাভাষণ, মাদক দ্রব্য সেবন ইত্যাদি থেকে বিরত থেকে কুশল কর্ম সম্পাদনের চেতনাই শীল। শীল পারমীর পরিপূর্ণতায় মানব জীবন পরিশুদ্ধ হয়। শীলে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির জীবন কলুষতাহীন এবং নির্বাণ অভিমুখী হয়। অপরদিকে দুঃশীল ব্যক্তির জীবন বেচেঁ থেকেও মৃতবৎ। সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় দুঃশীল ব্যক্তি দ্বারা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে প্রভূত অশান্তি সৃষ্টি হয়। এজন্য তথাগত বুদ্ধ শীলকে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

নৈষ্ক্রম্য পারমী : ‘নৈষ্ক্রম্য’ শব্দের অর্থ নির্গমন বা বের হয়ে যাওয়া। সংসার ধর্ম পরিত্যাগ করে বা সংসার হতে বের হয়ে বিশুদ্ধ জীবন যাপন করাকে নৈষ্ক্রম্য বলা হয়। জাগতিক ভোগ-বিলাস পরিত্যাগ করে সংসারের বন্ধন হতে মুক্তির জন্য উৎসাহী হওযার ব্রতকে নৈষ্ক্রম্য পারমী বলে।

প্রজ্ঞা পারমী : ‘প্রজ্ঞা’ শব্দের অর্থ হলো সম্যক চিন্তা। ভাবনার মাধ্যমে বিষয়বস্তুকে প্রকৃষ্টরূপে জানা। জ্ঞান অর্জনের সাধনাই হলো প্রজ্ঞা পারমী। প্রজ্ঞা পারমী তিন প্রকার। যথা: চিন্তাময় প্রজ্ঞা, শ্রুতময় প্রজ্ঞা এবং ভাবনাময় প্রজ্ঞা। অন্য কারো সাহায্য ব্যতীত পুনঃপুনঃ চিন্তা ভাবনার ফরে যে প্রজ্ঞা উৎপন্ন হয় তাকে চিন্তাময় প্রজ্ঞা বলে। সম্যকভাবে চিন্তা করলে সকল প্রকার কাজ ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা যায়। এটিই চিন্তাময় প্রজ্ঞা। তথাগত বুদ্ধের সর্বজ্ঞতা জ্ঞানকে চিন্তাময় প্রজ্ঞা বলা যেতে পারে। কারণ তিনি আপন অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই এ জ্ঞান অর্জন করেন। শ্রুতিময় প্রজ্ঞা দুভাবে অর্জন করা যায়। জ্ঞানী-গুণী বা গুরুর নিকট শুনে এ জ্ঞান অর্জন করা যায়। আবার অন্যের সাহায্য ব্যতীত গবেষণার মাধ্যমেও এ জ্ঞান লাভ করা যায়। ধ্যান সমাধির দ্বারা অর্জিত জ্ঞানকে ভাবনাময় প্রজ্ঞা বলে। প্রজ্ঞা পারমীর অনুশীলনে ক্লেশসমূহ ধ্বংস হয়। অনিত্য, দুঃখ এবং অনাত্মা সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি জাগ্রত হয়।

বীর্য পারমী : ‘বীর্য’ শব্দের অর্থ হলো বীরত্ব, কর্মশক্তি ইত্যাদি। প্রবল উৎসাহ ও সম্যক প্রচেষ্টার মাধ্যমে কঠিন ব্রত সম্পাদন করাই হচ্ছে বীর্য পারমী সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধত্ব লাভের পূর্বে বুদ্ধত্ব লাভের জন্য কঠোর সাধনা করেছিলেন। তিনি কঠিন সংকল্প করে বলেছিলেন, ‘আমার শরীর অস্থি মজ্জা শুকিয়ে গেলেও আমি বুদ্ধত্ব লাভ না করে এ আসন থেকে উঠব না।’ বুদ্ধত্ব লাভের এ প্রচেষ্টাই বীর্য পারমী।

ক্ষান্তি পারমী : ‘ক্ষান্তি’ পারমী হচ্ছে সহনশীলতার সাধনা। ক্ষান্তি শব্দের অর্থ হলো : ক্ষমা, সহিষ্ণুতা, নিবৃত্তি, বিরতি ইত্যাদি। ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ। জ্ঞানীগণ সর্বদা ক্ষান্তি ও সহিষ্ণুতার প্রশংসা করে থাকেন। শাস্ত্রে ক্ষান্তি ও তিতিক্ষাকে পরম তপস্যা বলা হয়েছে। সর্ব অবস্থায় ক্ষমা বা সহণশীলতা প্রদর্শনের ব্রতই হচ্ছে ক্ষান্তি পারমী। বুদ্ধবংস গ্রন্থে বলা হয়েছে: ‘পৃথিবীতে শুচি অশুচি নানাবিধ বস্তু নিক্ষিপ্ত হলেও পৃথিবী নীরবে সহ্য করে, নিক্ষেপকারীর প্রতি দয়া বা ক্রোধ কিছুই প্রদর্শন করে না। সেরূপ সকল মান-অপমান সহ্য করে ক্ষান্তি পারমী পূর্ণ করে সম্বোধি লাভ করতে হয়।’ সবল হয়েও যিনি দুর্বলকে ক্ষমা করেন তাঁর ক্ষান্তিই পরম ক্ষান্তি। ক্ষান্তি পারমী চর্চাকারী ব্যক্তি লাভ-অলাভ, যশ-অযশ, নিন্দা-প্রশংসা, সুখ-দুঃখ এই আট প্রকার লোক ধর্মে অবিচল থাকেন। তাঁরা পৃথিবীর ন্যায় মৌন, ইন্দ্রখীলের ন্যায় স্থির এবং স্বচ্ছ সরোবরের ন্যায় নির্মল হন। ক্রোধ আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ক্রোধ শুধু নিজের দগ্ধ করে না, অপরকেও দগ্ধ করে।

ক্রোধকে একমাত্র ক্ষান্তি পারমীর অনুশীলন দ্বারা দমন করা যায়।

সত্য পারমী : সর্বদা সত্যে প্রতিষ্ঠিত থাকার ব্রতকে সত্য পারমী বলে। বুদ্ধবংস গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘সপ্তম পারমী অর্থাৎ সত্য পারমী ব্রত দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে সত্যভাষি হলে সম্বোধি লাভের পথ সুগম হয়।’ সত্য পারমীতে কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকা প্রয়োজন।

অধিষ্ঠান পারমী :  ‘অধিষ্ঠান’ হলো দৃঢ় সংকল্পে অটল ও অচল থাকা। সর্ববিধ অন্তরায়কে পরাভূত করে কুশল কর্ম সম্পাদনে অবিচল থাকার ব্রতকে অধিষ্ঠান পারমী বলে। অধিষ্ঠান পারমীকে পারমীসমূহের মূলমন্ত্র বলা হয়। কারণ অধিষ্ঠান ছাড়া অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। মানব জীবনের সার্বিক কল্যাণের প্রধান অবলম্বন হলো অধিষ্ঠান। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সফলতার জন্য অধিষ্ঠান পারমীর অনুশীলন করা একান্ত প্রয়োজন। বুদ্ধবংস গ্রন্থে বলা হয়েছে : অধিষ্ঠান পারমী গ্রহণ করলে সম্বোধি অর্জিত হয়। অচল, সুপ্রতিষ্ঠিত শিলাময় পর্বত যেমন ঝড়-ঝঞ্ঝায় কম্পিত হয় না, স্বীয় স্থানে স্থিত থাকে, তদ্রুপ তুমিও অধিষ্ঠানে সর্বদা নিশ্চল হও। এরূপ অটল চিত্তের অধিকারী ব্যক্তি সম্বোধি লাভে সমর্থ হন।

মৈত্রী পারমী :  স্নেহ, মায়া, মমতা, বদ্ধুত্ব, প্রীতিভাব, ভালোবাসা ও উদারতা প্রদর্শন করাই হলো মৈত্রী। সর্ব প্রাণির প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করার ব্রতই হচ্ছে মৈত্রী পারমী। মৈত্রী পারমীর চর্চায় পরিপূর্ণভাবে মনুষ্রত্বের বিকাশ সাধিত হয়। মানব জীবনে সফলতা বা পরিপূর্ণতা আনয়ন করতে মৈত্রী পারমীর গুরুত্ব অপরিসীম। বুদ্ধবংস গ্রন্থে মৈত্রী পারমী সম্পর্কে এরূপ বর্ণিত আছে: জল যেমন সৎ-অসৎ, হীন-উত্তম, সকলকেই শীলতার দ্বারা শান্ত করে এবং শরীরের ময়লা বিদূরিত করে, তেমনি শত্রু-মিত্র সকলের প্রতি সমান প্রীতিভাব পোষণ করে মৈত্রী পারমীর সাধনা পূর্ণ করতে হয়।’ যাঁরা মৈত্রী সাধনা করেন তাঁদের হিংসা, ক্রোধ ইত্যাদি দূর হয়। তাঁদের কায়-মন-বাক্য সংযত হয়। তাঁরা সর্বপ্রাণীর মঙ্গল কামনা করেন এবং সকলের প্রিয় হন। তাই মৈত্রী ভাবনাকারীর কোনো শত্রু থাকে না। তাঁদের ইহকাল ও পরকাল সুখের হয়। যিনি সকল জীবের প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করেন, তিনি পরম শান্তি নির্বাণ লাভ করতে সক্ষম হন।

এ কারণে বুদ্ধ সকলকে মৈত্রী পারমী অনুশীলনের উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মা যেমন একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন, তেমনি সকল প্রাণীর প্রতি অপরিসীম মৈত্রীভাব পোষণ করবে।’ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি আনয়নে মৈত্রী পারমীর অনুশীলন করা একান্ত প্রয়োজন।

উপেক্ষা পারমী : ‘উপেক্ষা’ হলো সর্ববিষয়ে চিত্তের নিরপেক্ষ ও সাম্য অবস্থা। সাধারণত প্রিয় বস্তু বা ব্যক্তি দেখলে চিত্ত প্রফুল্র হয়, অপ্রিয় বস্তু বা ব্যক্তি দেখলে চিত্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়। অনুরূপভাবে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিতে চিত্ত আনন্দিত ও দুঃখিত হয়। যথাযথ নিরীক্ষণের মাধ্যমে সর্ব বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে চিত্তের নিরপেক্ষভাব বজায় রাখার ব্রত হলো উপেক্ষা পারমী। উপেক্ষা পারমীর অনুশীলনে চিত্ত আসক্তিহীন বা বিরক্তিহীন, অনুকূলতা বা প্রতিকূলতাবিহীন থাকে।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=6691

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Nov 7 2017. Filed under বৌদ্ধধর্ম. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।