“নাম” এ কি আছে?

Smiley face

শ্রীসত্যনারায়ণ গয়েষ্কাঃ অতীতের কথা। কোন ব্যক্তির মা-বাবা তার ছেলের নাম রেখেছিলেন “পাপক”। সে যখন বড় হলো, তখন ঐ নামটা তার ভীষণ কারাপ লাগতে লাগলো। তখন সে আচার্যের কাছে প্রার্থনা করল- ভান্তে, আমার নাম বদলে দিন। এই নাম খুব অপ্রিয়, কারণ এটা অশুভ, অমাঙ্গলিক এবং দুর্ভাগ্যসূচক। আচার্য তাকে বোঝালেন- দেখ, নাম হচ্ছে একটা “প্রজ্ঞপ্তি” মাত্র। ব্যবহার জগতে কাউকে ডাকার জন্য এই নামের প্রয়োজন। নাম পালটালে কোন মতলব সিদ্ধ হবে না। কারও নাম “পাপক” থাকলেও সৎকর্মের দ্বারা সে “ধার্মিক” হতে পারে। আবার কারো নাম “ধার্মিক” থাকলেও দুষ্কর্মের ফলে সে “পাপক” (পাপী) হতে পারে। আসল কথা হচ্ছে কর্মের। নাম পলটালে কি হবে?

good_and_bad

কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনলেন না! বারবার আচার্যকে অনুরোধ করতে লাগলেন। আচার্য তখন বললেন- কর্মশুদ্ধির দ্বারাই অর্থসিদ্ধি হয়, মঙ্গল হয়। তুমি যদি নামো শুদ্ধ করতে চাও তাহলে যাও, গ্রামে-নগরে যে ব্যক্তির নাম তোমার মাঙ্গলিক মনে হবে, আমাকে এসে জানাবে। তোমার নাম সেভাবেই পালটে দেওয়া হবে।

পাপক সুন্দর নামধারী লোকদের খুজতে বেরিয়ে পড়লেন। রাড়ী থেকে বের হওয়া মাত্রি তিনি এক শব-যাত্রা দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন কে মারা গেছে? লোকেরা বললো- জীবক। পাপক তখন ভাবতে লাগলেন- নাম তার জীবক, কিন্তু সে মৃত্যুর শিকার হল কেন?

আরো যেতে যেতে দেখলেন কন দীন-দরিদ্র দুঃখী তার স্ত্রীকে মারধোর করে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। তার নাম জিজ্ঞেস করে জানলেন- ধনপালী। পাপক ভাবতে লাগলে- নাম তার ধনপালী অথচ কর্পদকশূন্য?

আবারো যেতে যেতে দেখলেন- এক ব্যক্তি পথ হারিয়ে ফেলে লোকজকে পথের নিশানা জিজ্ঞেস করেছেন। তিনি তার নাম জিজ্ঞেস করে জানলেন- পন্থক। পাপক তহন আরো চিন্তায় পড়লেন- আরে! পন্থকো পন্থা (রাস্তা) জিজ্ঞেস করছে! পথিকও পথ হারায়!

পাপক ফিরে এলেন। নামের প্রতি তার আর কোন আকর্ষন বা বিকর্ষন রইল না। তিনি সব বুঝতে পারলেন। “নাম” এ কি আছে? জীবকও মরে অজীবকও মরে। ধনপালীও দরিদ্র হয়, অধনপালীও। পন্থকও পথ ভোলে, অপন্থকও। বাস্তবিক নামের তো কোন মাহাত্ন্যই নেই। যে জন্মান্ধ তারও নাম “নয়ন্সুখ” । জন্ম থেকে যে দুঃখী তারও নাম “সদাসুখ”। আমার নাম “পাপক”, কিন্তু আমার তো অমঙ্গল কিছু দেখছি না। অতএব নাম কিছুই নয়। আমি নিজের কর্মি শুদ্ধ করবো। কর্মি প্রমুখ। কর্মই প্রধান।

    যে কথা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও তাই প্রযোজ্য। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সমস্ত লোকই কি বোধিসম্পন্ন? জৈন-সম্প্রদায়ের সমস্ত লোকই কি আত্নজিত? ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সমস্ত লোকই কি ব্রহ্মবিহারী? ইসলাম-সম্প্রদায়ের সমস্ত লোকই কি আত্নসমর্পিত এবং শান্ত? প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যেই যেমন ভাল-মন্দ, আছে, তদ্রুপ পত্যেক সম্প্রদায়ের মধ্যেও ভাল-মন্দ লোক আছে। কোন সম্প্রদায়ের সব লোকই ভাল হতে পারে না আবার সব লোকই খারাপ হতে পারে না। কিন্তু সাম্প্রদায়িক আসক্তির কারণে আমরা নিজের সম্প্রদায়ের সম্প্রদায়ের প্রত্যেক ব্যাক্তিকে সজ্জন এবং অন্য সম্প্রদায়ের পত্যেক ব্যক্তিকে দুর্জন মনে করি। বৌদ্ধ, জৈন, খৃষ্টান বা মুসলিম বলা মাত্রই কোন ব্যক্তি সজ্জন বা দুর্জন হতে পারে না। বৌদ্ধ নামধারী ব্যক্তি পরম পূণয়বানও হতে পারে অথবা নিতান্ত পাপীও হতে পারে।এই কথা সকল সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। যেমন কোন ব্যক্তিকে চেনবার জন্য তাকে একটা নাম দেয়া হয়, সেইরূপ কোন সম্প্রদায়কে চেনার জন্য একটা নাম দেয়া হয় মাত্র। নামের সঙ্গে গুণের কোন সম্বন্ধ নেই। তেলভরা টিনের গায়ে “ঘি” এর লেবেল লাগিয়ে দিলেও তেল তেলই থেকে; বিশুদ্ধ ঘি হয়ে যায় না।কোন সুন্দর ব্যক্তির নাম “কুরূপ” রাখলে সে কুরূপ হ্যে যায় না, কোন রুরূপ ব্যক্তির নাম “সুন্দর” রাখলে সে সুন্দর হয়ে যায় না। ফুলকে কাঁটা অথবে কাঁটাকে ফুল বলতে থাকলেও ফুল ফুলই থাকে, কাঁটা কাঁটাই থাকে।

    কোন ব্যক্তি হয়ত দীন-দরিদ্র, কিন্তু তার নাম ‘রাজন্য’। এই ব্যক্তি যতদিন বুঝবে যে তার ‘রাজন্য’ নাম কেবল সম্বোধনের জন্য, আসলে সে দরিদ্র, ততদিন সে সজ্ঞানে আছে বলতে হবে। কিন্তু যেদিন সে ঐ নামের দম্ভ মাথায় চাপিয়ে দীন-দরিদ্র হয়েও নিজেকে প্রতাপ্সহালী রাজা এবং অন্য সকলে হেয় দৃষ্টিতে দেখতে সুরু করবে, তখন তাকে পাগল ছাড়া কেউ বলবে না। লোকের উপহাসের পাত্রই হবে সে।কিন্তু “রাজন্য” নামধারী  হাজার-লক্ষ দীন-দরিদ্র সংগঠিত হয়ে নিজে “রাজা” রাজা মনে করতে থাকে এবং অন্য সকলকে হেয় দৃষ্টিতে দেখতে থাকে, তাহলে পাগলদের এই পাগলামী কেবল উপহাসাম্পদই নয়, বরং গোটা সমাজের পক্ষেই বিপদের কারন হয়। ঠিক এইদশা আমাদের হয়, যখন আমরা জাতীয়তা, সাম্প্রদায়িকতা বা রাষ্ট্র্যতার ইন্ধন যোগিয়ে প্রমত্ত হয় উঠি এওবং জিজেই জিজেকে অন্যদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে মনে করতে থাকি এবং অন্যদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখতে থাকি।এই অবস্থায় আমরাও গোটা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক এবং অশান্তির কারণ হয়ে থাকি। ফলে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনি, নিজের অশান্তি জিজে সৃষ্টি করি। সুখশান্তি হারিয়ে প্রকৃত ধর্ম থেকে দূরে সরে যাই।

    ধর্মকে জাতি, বর্ণ, বর্গ, সমুদায়, সম্প্রদায়, দেশ, রাষ্ট্রের সীমাতে বাঁধা যায় না। মানব সমাজের যে কন শ্রেণীতে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি থাকতে পারে। ধর্মের উপর কোন এক বর্ণবিশেষেরই একচ্ছত্রাধিকার থাকতে পারে না। ধর্ম আমাদের ভাল মানুষ’ হতে শিক্ষা দেয়। ভাল মানুষ ভাল মানুষই। সে শুধুমাত্র নিজের সম্প্রদায়ের নয়, বরনং সারা মানব সমাজের শোভা। যে ভাল মানুষ নয় সে ভাল হিন্দু বা মুসলমান, ভাল বৌদ্ধ বা জৈন, ভাল ভারতীয় বা বর্মী, ভাল ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় কিভাবে হবে?আর সে ভাল মানুষ হয়েছে সে যথার্থ অর্থে ধর্মবান। তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, কিছু এসে যাবে না। গোলাপ গোলাপই থাকে। নাম পালটে দিলেও তার গুণের কন তারতম্য হয় না। যে বাগানে গোলাপ ফুটবে কেবল সেই বাগানকেই নয়, আশাপাশের সারা বায়ুমন্ডল্কেই জিজের সৌরভে সুরভিত করে। অতএব আসল কথা হচ্ছে, আমাদের ধ্ররম্পরায়ণ হতে হবে। ভাল মানুষ হতে হবে। নাম যাই হোক না কেন। যে বাগানই কোক না কেন, তাতে যে নামেরই বোর্ড লাগানো হোক না কেন- কিছু এসে যায় না। সেখানে ফুল ফুটতে হবে, ফুলের সৌরভ ছড়াবে- তা না হলে সেই বাগানের কোন সার্থকতা নেই।

    সাম্প্রদায়িক্তা এবং জাতীয়তার রঙ্গীন চশমা খুলে ফেলে দেখলেই ধর্মের শুদ্ধ রূপ প্রকটিত হবে। অন্যথা নিজের সম্প্রদায়েরই রং-চাকচিক্য নাম্লেবেলই প্রাধান্য পেয়ে যাবে। ফলে ধর্মের সার গুরুত্ববিহীন হয়ে যাবে। ধর্মের কষ্টিপাথরে কোন ব্যক্তিকে প্রীক্ষা করতে হলে এটা দেখা উচিত নয় যে সে কোন সম্প্রদায়ে দিক্ষিত? অন্যতা কোন দার্শনিক মান্যতাকে মেনে চলে? অথবা কি কি সনস্কার পালন করে?বরং এটা দেখা উচিত যে তার আচরণ কিরূপ? জীবন-ব্যবহার কিরূপ? ভাল না মন্দ? কুশল না অকুশল? সেটা পবিত্র কিনা, শুদ্ধ কিনা? আত্নমঙ্গল্কারী এবং লোকমঙ্গলকারী কিনা? যদি হয়, তাহলে সে যথার্থ ধর্মবান। সতটুকু আছে ততটুকুই ধর্মবান। সদি না থেকে , তাহলে ধর্মের সঙ্গে সেই ব্যক্তির কোন সম্বন্ধ নেই। সে যে নামেই পরিচিত হোক না কেন যে সম্প্রদায়েরই হোক না কেন, যে তক্মাই লাগিয়ে চলুক না কেন। এই সাম্প্রদায়িক তকমার সঙ্গে ধর্মের কিই বা সম্বন্ধ! চমকদার নাম এবং তকমা থেকে আমরা কিই বা পেতে পারি! কারো কোন কিছু পাওয়া সম্ভব কি? মদে ভরা বোতলে দুধের লেবেল লাগানো থাকলেও সেটা পান করলে আমাদের নেশাই হবে। যদি তাতে জল ভরা থাকে, তাহলে সেটা পা করে তেষ্টা মেটান যেতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যবান হওয়া যাবে না। স্বাস্থ্যবান হতে হলে বিশুদ্ধ দুধ পান করতে হবে। বোতলের রং-রূপ বা লেবেল যাই হোক না কেন- কিছু এসে যায় না। এই “নাম” আর ‘লেবেল” এ কি আছে? সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তা এবং রাষ্ট্রীয়তার ভূত মাথায় চেপে বস্লে কেবল বোতল এবং বোতলের নাম এবং লেবেলই মুখ্য আকার ধারণ করে, দুধ গৌণ হয়ে যায় ধর্ম গৌণ হয়ে যায়।

    আপনারা আসুন, এই নাম এবং লেবেলের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের আচরন শুদ্ধ করুন। বক সংযম করার জন্য মিথ্যা, কর্কশ, চুকলি, নিন্দা এবং নিরর্থক প্রলাপ থেকে নিজেকে বাঁচান। শরীওরকে সংযত করার জন্য হিংস, চুরি, ব্যভিচার এবং নেশাপান থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। নিজের জীবিকা শুদ্ধ করুন, জন-অহিতকারী ব্যবসা থেকে নিজেকে বাঁচান। মঙ্কে সংযত করার জন্য তাঁকে নিজের বশে রাখাতে শিখুন। তাকে সতত সাবধান সজাগ হয়ে থাকার অভ্যাস করাতে হবে এবং প্রতিমুহুর্তে ঘটমান ঘটনাকে ‘যেমন যেমন” ভাবে সাক্ষীভাবে দেখতে পারার সামর্থ্য বাড়িয়ে পরিশেষে রাগ, দ্বেষ এবং মোহগ্রস্থিকে দূর করুন। চিত্তকে মর্মল করুন- তাকে অনন্ত মৈত্রী এবং করুণার দ্বারা পূর্ণ করুন। নাম-লেবেলবিহীন ধর্মের ইহাই মঙ্গলবিধান।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=1344

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on May 1 2016. Filed under জীবন চর্চা, প্রবন্ধ. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।