Dec 19, 2016
77 Views
0 0

নির্বাণ

লিখেছেন:

চয়নিকা রিতিকা: জীবন প্রবাহের পরিসমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত জন্ম-মৃত্যুর এই চক্র অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে।সুতরাং বলা যায়, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ঐকান্তিক লক্ষ্য নির্বাণ ধাতুতে প্রবেশ করা।

পালি শব্দ “নিব্বাণা” এসেছে নি এবং বাণ থেকে, নি অর্থ নেই বাণ অর্থ তৃষ্ণা অথবা কামনা-বাসনা। ‘বাণ’ বা তৃষ্ণার সম্পূর্ণ বিনাশ হয় বলে একে বলা হয় নির্বাণ, আরেক ভাবে নির্বাণ অর্থ অনাসক্তি।

লোভ, দ্বেষ, অবিদ্যার পরিসমাপ্তিকেও নির্বাণ বলা যেতে পারে, “বিশ্বব্যাপি আগুন জ্বলছে” বলেছেন বুদ্ধ “কিন্তু কি কারণে আগুন জ্বলছে? এই আগুন জ্বলছে লোভ, দ্বেষ, অবিদ্যার করণে, জন্মগ্রহণ, বৃদ্ধ বয়স, মৃত্যু, দুঃখ যন্ত্রণা, অনুতাপ, শোক-দুঃখ, হতাশা, নিরাশা এই আগুন জ্বালিয়েছে।

enlightenment

একথা ভাবা সমীচিন নয় যে নির্বাণ শূন্যতা কিংবা চিত্ত বিলুপ্তির এমন এক অবস্থা যা আমরা আমাদের পার্থিব জ্ঞানে উপলব্দি করতে পারি। একজন অন্ধলোক আলো দেখে না বলেই জগতে আলোর অস্তিত্ব নেই একথা আমরা বলতে পারি না। সুপরিচিত একটি গল্প ও দেখা যায় একটি মাছ তার কচ্ছপ বন্ধুর সাথে তর্ক-বিতর্ক শেষে জগতে স্থলভাগের অস্থিত্ব নেই বলে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে।

বৌদ্ধ ধর্মে নির্বাণ বলতে শুধুমাত্র শূণ্যতা কিংবা চিত্ত বিলুপ্তি বুঝায় না। কিন্তু এই শব্দটির যথার্থ অর্থ প্রকাশক কোন শব্দ নেই, নির্বাণ এমন একটি ধর্ম যা “অজাত, অনুৎপন্ন, স্বয়ংসৃষ্ট এবং অস্থানি” একারণে নির্বাণ শাশ্বত, শুভ এবং সুখময়।

নির্বাণে দুঃখ যন্ত্রণার বিনাশ ব্যতীত কোন কিছুই চিরস্থায়ী হয় না, কিংবা দুঃখ যন্ত্রণা ব্যতীত কোন কিছুই বিলয় হয় না।

বই-পত্রে নির্বাণকে সোপাদিশেষ এবং অনুপাদিশেষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নির্বাণ অদ্বিতীয়। মৃত্যু পূর্ব্বর্তী এবং পরবর্তী নির্বাণ উপলব্দি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই দুই প্রকার পার্থক্যের অবতারণা করা হয়েছে।

নির্বাণ কোন স্থানে অবস্থিত নয় কিংবা পরমসত্তা’র অবস্থান স্বর্গলোক নয়। নির্বাণ আমাদের এই দেহের মধ্যেই বর্তমান। নির্বাণ এমন একটি লক্ষ্য (ধর্ম) যা সকলেই অর্জন করতে পারে। নির্বাণ এমন এক অপার্থিব অবস্থা যা ইহজীবনেই অর্জন করা সম্ভব। এখানেই বৌদ্ধ ধর্মের নির্বাণ বিষয়ক ধারণার সাথে শাশ্বত স্বর্গ প্রাপ্তির অবৌদ্ধিক ধারণার প্রধান পার্থক্য বিদ্যামান যে লক্ষ্যে শুধুমাত্র মৃত্যুর পরেই অথবা মৃত্যু পরবর্তী জীবনে স্রষ্টার সাথে কিংবা পরমসত্তার সাথে মিলনের মাধ্যমেই উপনীত হওয়া যায়। পঞ্চস্কন্ধ বর্তমান থাকা অবস্থায় যে নির্বাণ উপলব্দি হয় তাকে সোপাদিশেষ নির্বাণ বলে। যখন একজন অর্হৎ পরিনির্বাণ লাভ করেন, পঞ্চস্কন্ধ অবসানের পর তাঁর দৈহিক অস্তিত্বের কোন চিহ্ন বর্তমান থাকে না তাকে অনুপাদিশেষ নির্বাণ বলে।

স্যার এডইউন আর্ণল্ড বলেছেন, “যদি কেউ শেখায় নির্বাণ সমাপ্তি বলবে সে মিথ্যা বলেছে। যদি কেউ শেখায় নির্বাণ অনন্ত জীবন বলবে সে ভূল বলছে”। অধিবিদ্যক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাণ দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি, মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাণ আমিত্ব বোধ এর বিনাশ সাধন, নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাণ লোভ, দ্বেষ, মোহ এর বিলুপ্তি।

মৃত্যুর পর একজন অর্হৎ অস্তিত্বশীল থাকেন নাকী থাকেন না?

প্রত্যুত্তরে বুদ্ধ বলেছে, “পঞ্চস্কন্ধের বিনাশ সাধনকারী একজন অর্হৎ পরাক্রমশালী মহাসমুদ্রের ন্যায় অসীম ও বিশাল। বলা যায় যে একজন অর্হৎ এর পূণ্ররজন্ম গ্রহণের কোন তৃষ্ণা বর্তমান না থাকায় একজন অর্হৎ এর পূণর্জন্ম হয় না”।

কেউ এ কথা বলতে পারে না যে পূণর্জন্ম সৃষ্টিকারী সকল তৃষ্ণায় এর কারণে একজন অর্হৎ নবজীবন লাভ করেন, একথাও বলা যায় না যে সকল তৃষ্ণার অবসানে একজন অর্হৎ এর বিলুপ্তি ঘটেছে।

রবার্ট ওপেনহাইমার নামক একজন বিজ্ঞানী লিখেছেনঃ উদাহরণ স্বরুপ যদি আমরা প্রশন করি ইলেকট্রন এর অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে কিনা, উত্তর হবে “না” যদি প্রশন করি সময়ের সাথে সাথে ইলেকট্রন এর অবস্থান পরিবর্তিত হয় কিনা, উত্তর হবে “না” যদি প্রশ্ন করি ইলেকট্রন নিশ্চল থাকে নিনা, উত্তর আসবে, “না” যদি প্রশ্ন করি ইলেকট্রন গতিশীল কিনা, অবশ্যি উত্তর হবে “না”।

“মৃত্যু পরবর্তী অর্হৎ এর অস্তিত্ব বিষয়ক প্রশ্নের বুদ্ধ এই ধরণের উত্তর দিয়েছেন; কিন্তু তাঁর বক্তব্য সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথাগত বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় সুপরিচিত ছিলো না। ধন্যবাদ।

  • এই প্রবন্ধটি Narada Thera রচিত ‘BUDDHISM IN A NUTSHELL’ গ্রন্থের Chapter Ten- এর “NIBBANA” (পৃষ্ঠা- ৫৫) প্রবন্ধের বাংলা অনুবাদ।
  • চয়নিকা রিতিকাঃ সাহিত্য অনুরাগী ও সংস্কৃতি কর্মী। অনুসন্ধিৎসু লেখক।
Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।
Article Categories:
প্রবন্ধ
এক্সিকিউটিভ এডিটর । দি বুড্ডিস্ট টাইমস ডটকম
http://www.thebuddhisttimes.com

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ।

Comments to নির্বাণ

  • অনুবাদ নিঃসন্দেহে বেশ ভালো হয়েছে। তবে আমার কিছু মন্তব্য আছে আসল লেখাটার বিষয়ে। সেখানে বলা হয়েছে ” Nibbana is a dhamma which is “unborn, unoriginated, uncreated and unformed”. Hence it is eternal (Dhuva), desirable (Subha) and happy (sukha)”. আমার মনে হয় শেষ কথাটা বাদ দেওয়াই ভালো (পারলে মাঝেরটাও)। সমস্যা হচ্ছে নিব্বানা’র প্রকৃতি নিয়ে। এটা দুখের অবসান ঘটায় কিন্তু সুখময় বলাটা ঠিক না। দূঃখের বিপরীত শব্দ সুখ হলেও, নিব্বানাতে সুখেরও অবস্থান নেই। এটা সুখ-দুঃখ বিহীন অবস্থা।

    Baishakhi Dallas December 20, 2016 2:33 am

Leave a Comment

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।