মুই তমারে হোচ পাং:

পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারীদের সুন্দর সংস্কৃতি নিয়ে একটি লিখা

Smiley face

টমটমে চড়ে ঘুরতে বেরিয়েছি, হঠাৎ চাকমা এক মেয়ে হাত দেখালো টমটমকে টমটম দাঁড়ালো আর মেয়েটি আমার মুখোমুখি অপর সিটে বসে পড়ল। টমটম হচ্ছে সিএনজির মতো একপ্রকার ছোট গাড়ি যা ব্যাটিরেতে চলে, পার্বত্য অঞ্চলে এসব গাড়ি খুব বেশি। যদিও চাকমা মেয়ে বললাম আসলে ১৫-১৮ বছরের এই মেয়েটি চাকমা নাকি মারমা নাকি তাদের অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী আমি জানিনা আমরা কাছে সবাইকে এক ধরণেরই মনে হয়। সবারই নাক চ্যাপ্টা তাই পার্থক্য বুঝতে পারি না। মেয়েটিকে দেখেই বিরক্তি উৎপন্ন হলো মনে। কারণ এই মেয়েটির পোশাক কেমন জানি। দু হাত কাটা অর্থাৎ দুই হাতের অংশটুকুতে কোনো কাপড় নেই। আমি যতদূর জানি এই অঞ্চলে বসবাসকারী যুবতী মেয়েদের মধ্যে খুব কমই আছে যারা এ ধরণের পোশাক পড়ে। পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাঘুরির কারণে মোটামুটি তাদের পোশাক সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আমার আছে। তাদের দুইটি জিনিস আমার খুব ভালো লাগে। প্রথমটি মনোমুগ্ধকর ডিজাইনে গড়া বিহার। তাই সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়াই। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন জায়গায় আমি গিয়েছি সেগুলোর মধ্যে- লোগাং হারুবিল থেকে শুরু করে, দিঘীনালা, লংগদু এমনকি শান্তি বাহিনীর এক সময়ের ঘাটি বলে পরিচিত কালা পাহাড় (ডাকঘরমণ) ও বাদ যায় নি। পছন্দের অপর জিনিসটি হচ্ছে তাদের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের খাদ্য। অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের খাদ্য খেতে গিয়ে মাঝে মাঝে শরীরও ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়েছে আমায়। একবার মুন্ডি খেয়েছিলাম। পোড়া মরিচ এর গুড়ার সাথে টক পানি আর তার ভিতরে নুডলস এর মতো। স্বাদটা মনে হয়েছে যেন টক দিয়ে কচুরলতি রান্নার মতো। স্বাদ যাই হোক না কেনো এই মুন্ডির কথা অনেকদিন মনে থাকবে কারণ খাওয়ার পরদিন একটি কক্ষের সাথে আমার বন্ধুত্ব করতে হয়েছিল। ফিরে আসি হাতা কাটা জামা পড়া মেয়েটির কথায়।

এমনিতে হলে এত বেশি হয়তো তাকাতাম না কিন্তু উঠামাত্রেই তার প্রতি বিরক্তিকর এক অনুভূতি উৎপন্ন হওয়ায় মাঝে মাঝে আড় চোখে তাকাচ্ছি মেয়েটির দিকে। মেয়েটিকে দেখতে আসলে এতটা অভদ্র মনে হচ্ছে না তবে তার পোশাকটার প্রতি আমার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণই বিরক্তির মূল কারণ (বর্তমান এই আধুনিক যুগে কেউ কেউ আমার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক) মেয়েটিকেও আধুনিক বলতে পারি। আড় চোখে তাকাতে তাকাতে একসময় মনে হলো যেন মেয়েটি টমটম থেকে পড়ে যা্চ্ছে, আমি ভালোভাবে খেয়াল করতেই দেখি মেয়েটি আসলে অনেকটা নিচু হয়ে নমস্কার করছে। সাথে সাথে মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম টমটমটি য়ংড বৌদ্ধ বিহার অতিক্রম করে যাচ্ছিল। আর মেয়েটি সেই বিহারের উদ্দেশ্যে বুদ্ধের উদ্দেশ্যেই প্রণতি জানালো। এতক্ষণ তার প্রতি যে বিরক্তির ভাব ছিল তা নিমিষেই কেটে গেলো। তার প্রতি অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করলো। এই ধরণের ঘটনা আগেও দেখেছি। যখনই পার্বত্য অঞ্চলের লোকজনেরা বিহারের পাশ দিয়ে যায় বিহারের প্রতি মাথা নত করতে তারা একটু দ্বিধা করে না। তাদের এই সংস্কৃতির সাথে মিলাতে গেলে সমতলে বৌদ্ধদের মধ্যে কদাচিৎ এমনটা দেখা যায়। বলা যায় তাদের এই সংস্কৃতি সমতলে নেই বললেই চলে।

এরকম তাদের আরো কিছু সুন্দর সংস্কৃতির কথা তুলে ধরতে চাই-

  • তারা যখন বিহারে যায় বিশেষ করে কঠিন চীবর দানগুলোতে দেখবেন তাদের চীবরগুলো সব সময় মাথার উপরে থাকে। একদিকে কঠিন চীবর দানের মহাপুণ্যে অন্যদিকে তাদের যে দানীয় বস্তুর প্রতি অনন্য শ্রদ্ধা দুইয়ে মিলে তাদের কুশল চেতনার ভান্ডার যেন পরিপূর্ণ হয়।
  • তাদের জমিতে যখন নতুন ফসল আসে তখন নতুন ফসলের তৈরী খাদ্য নিয়ে তারা প্রথমে বিহারে যায়।
  • রাস্তা দিয়ে যখন ভিক্ষুসংঘকে যেতে দেখে তখনই তারা হাত জোড় করে দাড়িয়ে যায়।
  • তাদের অনুষ্ঠানগুলোতে তাদেরই কোনো গৃহী অতিথি হয়ে গেলে তারা কোনোদিন ভান্তের পাশে বসে না।
  • পালার ছোয়াইং আসলে তারা একত্রে কয়েক পরিবার বিভিন্ন দ্রব্যাদি নিয়ে বিহারে যায় বিহারে অবস্থান করে সেখানে রান্না করে ভান্তেদের ছোয়াইং দেয়। মাঝে মাঝে দেখা যায় এই ছোয়াইং এর জন্য আনা উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে ভান্তেদেরকে ধর্মীয় বই ছাপিয়ে দেয়।
  • বিহারে ধর্মদেশনা যখন চলে তখন তারা পাশের জনের সাথে গল্পগুজবে মত্ত হয় না। ভান্তেরা কোনো প্রশ্ন করলে হাতজোড় করে ভান্তে, ভান্তে বলে শ্রদ্ধা সহকারে উত্তর দেয়।
  • যে কোনো ধরণের পরীক্ষার আগে ছাত্র/ছাত্রীরা মা বাবাদের নিয়ে বিহারে আসে দানের আয়োজন করে।
  • তাদের অনুষ্ঠানগুলোতেও দেখা যায় তারা উৎসর্গের পর্ব আগে শেষ করে। তারপর বাকী যারা থাকতে পারে তাদেরকে দেশনা দেওয়া হয়, তারাও অচঞ্চল চিত্তে দেশনা শুনে যেখানে দায়কদের তেমন বক্তব্য থাকে না।
  • যে কোন বিহার নির্মাণে দেখা যায় নর-নারী উভয়েই তারা প্রচুর পরিমাণে কায়িক শ্রম দেয়।

গত বছর হারুবিলে আরেকটি সুন্দর উৎসব দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেটি হচ্ছে আকাশ প্রদীপ প্রজ্জ্বলন। কঠিন চীবর দান যেদিন শেষ হয় তার পর দিন থেকে একমাস ব্যাপী এটি চলে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই অনুষ্ঠানটি হয় যেখানে গ্রামের বৃদ্ধ-বদ্ধা, যুবক-যুবতী সবাই উপস্থিত হয়, একত্রে বন্ধনা করে।

এই অনুষ্ঠানটি সমতলে হতে দেখা যায় না। এই অনুষ্ঠানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে তা হলো গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারের লোকজনের আগমন। মনে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মের কথা। তারা যেন সেই নিয়মেই একত্রে আসে, একত্রে যায়।

এভাবে লিখতে গেলে আরো অসংখ্য বিষয় আছে যা লেখা যায়। যদিও তাদের সবগুলোই যে গুণ তা নয়। তাদেরও নানা ধরণের সংকীর্ণতা আছে তবে অর্ধেক গ্লাস খালি না বলে অর্ধেক গ্লাস ভরা বলে ভালো গুণগুলো খুঁজে নেওয়াই উত্তম বলে মনে করি। তাদের উপরোল্লিখিত সুন্দর গুণাবলী সমতলীয় তথা সকল বৌদ্ধদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক এই কামনা করি। আর পার্বত্য অঞ্চলের এসব ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধদের সুন্দর গুণাবলী গুলোকে স্যালুট দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে —মুই তমারে হোচ পাং চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা….।

  • লেখক : সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।
Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=6723

উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু Posted by on Nov 14 2017. Filed under এক্সক্লুসিভ, প্রবন্ধ. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।