পুনর্জন্ম ব্যাখ্যা নিয়ে কিছু ভিক্ষু ও ভিক্ষুনীদের অপতৎপরতা প্রসঙ্গে নশ্বর সুজয়ের যৌক্তিক নিবন্ধ:

পুনজন্ম নিয়ে কেন এতো অপচর্চা?

Smiley face

নশ্বর সুজয়। ছবি: ফেইসবুক প্রোফাইল।

নশ্বর সুজয়ঃ আমার অবাক লাগে, যখন দেখি জন্মান্তরবাদ তথা পুণজন্মের বিশ্বাস করে না এমন ভিক্ষু তথা ভিক্ষুণীরাও মানুষের দ্বারে দ্বারে পিণ্ডদান ও চারিপ্রত্যয় সংগ্রহ করে।

প্রশ্ন হচ্ছে— যদি পুণজন্ম বা জন্মানতরবাদ না মানেন তাহলে দাতারা (গৃহীরা) কি হেতুতে আপনাদেরকে এতো দান ধর্ম সহ পুণ্যকর্ম করবে?

পুনজন্ম না থাকলে এতো ধর্মকথার বা ধর্মচর্চার ভিত কোথায়? দানে যে দাতার আয়ু বর্ণ সুখ বল বৃদ্ধি হয় এর যৌক্তিকতা কোথায়?

বুদ্ধের আর্য অষ্টমার্গসত্যের ভিত কোথায়? ৩৭ বোধিপক্ষীয় ধর্মের ভিত কোথায়? অবিদ্যাদি দ্বাদশ অঙ্গের ভিত কোথায়? সপ্তবোধ্যঙ্গের ভিত কোথায়? চারি ব্রহ্মবিহারের ভিত কোথায়? চারি আর্য সত্যের প্রথম সত্যের ভিত কোথায়? যেখানে বলা হচ্ছে— জাতি পি দুক্খা। জন্ম গ্রহন করা দুঃখ। ইত্যাদি ইত্যাদি।

যারা ঈশ্বর বিশ্বাসী তাদের বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম তো ঈশ্বরবাদী ধর্ম নয়, বৌদ্ধধর্মে জন্ম-মৃত্যু পাপ-পুণ্য, স্বর্গ নরক প্রতিটি বিষয়ের যৌক্তিকতা আছে এবং ইহাই বৌদ্ধদর্শনের অর্ন্তগত।

ত্রিপিটকের কোন সুত্র বা আলোচনা বা বুদ্ধদর্শনে পুণজন্মকে কোথায় অস্বীকার করা হয়েছে?

বুদ্ধের সর্বপ্রথম উক্তিটিতে কি বলা হয়েছে- ?

অনেক জাতি সংসারং সন্ধাবিস্সং অনিব্বিসং;

গহকারকং গবেসন্তো দুক্খা জাতি পুনপ্পনং।

(ধম্মপদ-জরাবর্গ-৮)

অর্থাৎ : এ (দেহরূপ) গৃহের নির্মাতাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে (জ্ঞানাভাবে) তাকে না পেয়ে আমি বহু জন্মজন্মান্তর সংসার পরিভ্রমণ করলাম। বার বার জন্ম গ্রহণ করা দুঃখজনক।

থেরগাথা থেরীগাথায় বর্ণিত থের-থেরীগণের অতীতের জন্মপরিক্রমা কি মিথ্যা?

ত্রিপিটকে বর্ণিত এই গাথাগুলো ভিত কোথায়?-

সংসরং হি নিরযং অগঞ্জিস্সং,

পেতলোকমগমং পুনপ্পনং

দুক্খম্মিহ পি তিরচ্ছানযোনিযা

নেকধা হি বুসিতং চিরস্মযা।

মানুসোপি চ ভবোভিরাধিতো

সগ্গকাযমগমং সকিং সকিং

রূপধাতূসু অরূপধাতূসু

নেবসঞ্ঞীসু অসঞ্ঞীসু ঠিতং।

অর্থাৎ আদি অন্ত বিরহিত সংসারে পুনপুন জন্মগ্রহন করেছি, অষ্ট নিরয় সহ প্রেতলোকেও জন্মগ্রহন করেছি। তির্যক যোনিতেও বহুবার জন্মেছি, কখনও কখনও স্বর্গেও জন্মেছি, এছাড়াও রূপারূপ নৈবসংজ্ঞা নাসংজ্ঞা ভবেও জন্ম গ্রহন করেছি।

প্রসঙ্গ হচ্ছে— এখানে বাংলাদেশের বেশকিছু নব্য দার্শনিক বৌদ্ধধর্মের পুণজন্ম বা জন্মানতরবাদকে স্বীকার করতে নারাজ । এদের এমন প্রচারনাকে বৌদ্ধিক ব্যাখ্যায় সমর্থনে বেশকিছু ভিক্ষু ও ভিক্ষুনীরা তৎপর। তাদের দাবী “কাউকে পুনজন্ম নিতে হবে না”।

এখন কথা হচ্ছে— বৌদ্ধ দর্শন বা ধর্ম থেকে যদি পুনজন্ম বিষয়টি বাদ দেওয়া হয় তাহলে, পাপ পুণ্য কুশল অকুশল কর্তা কর্ম এগুলোর ভিত্তি কোথায়? আর আপনারও কেনইবা দাতার মুখাপেক্ষি হয়ে থাকেন? কেনই দান-ধর্মে অংশগ্রহণ করেন?

রাজা মিলিন্দ ছিলেন বৌদ্ধ ইতিহাসের একজন সেরা তার্কিক। রাজা মিলিন্দের জীবনীতে দেখতে পাই, তিনি নানা জটিল প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান করতে তৎকালীন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ব্রাহ্মন সহ ভিক্ষুদের নিকট উপস্থিত হতেন নানা উপঢৌকন নিয়ে। একদিন এক ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাস করলেন- আর্য! আপনি কি পুনজন্মে বিশ্বাসী? দানের কি কোন ফল আছে? একে অন্যকে সম্মান গৌরব করার ফল কি?

উত্তরে ব্রাম্মণ- না মহাশয়! দানের কোন ফল নেই, পাপ পুণ্যের কোন ফল নেই, পুনজন্মের কোনো ভিত্তি নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্রাম্মণের এমন উত্তরে রাজা আর দেরি না করে সোজা প্রস্থান করলেন। যে উপঢৌকন ব্রাম্মণকে দিতে স্থির করেছিলেন তাও আর দিলেন না, এমনকি কোনোরূপ সম্মান গৌরবও দেখাননি ব্রাম্মণকে। যেহেতু ব্রাহ্মনের দাবী পুনজন্ম নেই, দানের ফল নেই, ফলের ভোক্তা নেই।

পুনজন্ম যদি না থাকে তাহলে দশকুশল ও দশ অকুশল কর্মের ভিত কোথায়? কেনই বা আপনারা সন্যাসব্রত উদযাপন করছেন? কেনই বা এতো এতো প্রজ্ঞা আলোচনা , এতো প্রজ্ঞা কথা?

বুদ্ধের ভক্তদের রাজন্যবর্গের মধ্যেই লিচ্ছবিদের সিংহ সেনাপতি অন্যতম। তিনি ছিলেন জৈনধর্মের প্রবর্তক নির্গ্রন্থনাথ পুত্রের নামজাদা শিষ্য। তিনি মন্ত্রীপরিষদে বুদ্ধের নানা প্রসংসা শুনে বুদ্ধকে দর্শন করতে স্থির করেন; এমনকি গুরুবর নির্গ্রন্থনাথপুত্রের অনুমতি চাইলে- তাতে নানা নিষেধও করা হয়। তারপরও তিনি বুদ্ধের দর্শনে গেলেন; বুদ্ধ তখন লিচ্ছবিদের কুটাগারশালায় অবস্থান করছিলেন। সেনাপতি সিংহ তথায় উপস্থিত হন এবং জিজ্ঞাসা করেন- ভদন্ত! আমি শুনেছি শ্রামন গৌতম অক্রিয়াবাদী এবং অক্রিয়াবাদের দেশনা করে শ্রাবকদের বিনীত করেন? প্রত্যুত্তরে বুদ্ধ- সেনাপতি সিংহ, কেউ আমাকে অক্রিয়াবাদী, কেউ ক্রিয়াবাদী আবার কেউ উচ্ছেদবাদী বলে অভিহিত করেন। আমাকে অক্রিয়াবাদী বলার কারন হল আমি কায়িক বাচনিক ও মানসিক দুস্ক্রিয়াকে এবং নানাবিধ পাপকর্ম অকুশল ধর্মকে অক্রিয়া বা অকরনীয় বলে থাকি। ক্রিয়াবাদী বলার কারন হল- আমি কায়িক বাচনিক ও মানসিক সদাচার এবং নানাবিধ কুশল ধর্মকে ক্রিয়া বা করনীয় বলে থাকি। উচ্ছেদবাদী বলার কারন হল- আমি রাগ দ্বেষ মোহ এবং বিবিধ পাপকর্ম অকুশল ধর্মের উচ্ছেদ বা বিনাশ সাধন করতে বলে থাকি।

মজ্ঝিমনিকায়ে (৩/২০৩, ২০৬) বুদ্ধ কর্মের অবিচ্ছেদ্যতা প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘সত্তাসমূহ কম-সক (কর্মই তার স্বীয় আত্মীয়), কম্ম-দায়াদ (স্ব স্ব কর্মের ফলভোগী), কর্মযোনি (কর্মানুসারে জাত), কর্ম-বন্ধু ও কর্ম-পটিসরণ (কর্মাশ্রিত)।

এছাড়াও ত্রিপিটকের বুদ্ধ ভাষিত

মচ্ছের সুত্তে উল্লেখ্ আছে-

যে ধ মচ্ছরিনো লোকে কদরিয়া পরিভাসকা

অঞেসং দদমানানং অন্তরায় করা নরা,

নিরং তিরচ্ছান যোনিং যমলোকং চুপ্পজ্জরে,

সচে এন্তি মনুস্সত্তং দলিদ্দে জায়রে কুলে।

অর্থাৎ যারা পরশ্রীকাতর কদর্য কটুভাষী দান বিঘ্নকারী তারা মৃত্যুর পরে নিরয়ে গমন করে; পশু যোনিতে জন্ম নেয়, যমলোকে উৎপন্ন হয়; যদি মনুষ্যকুলে জন্ম গ্রহন করে দরিদ্রের ঘরে জন্ম হয়। অন্ধ বধির মূর্ক বিকলাঙ্গ প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়।

প্রশ্ন হচ্ছে— বুদ্ধ ভাষিত উক্ত বর্ণনা গুলো কি পুনজন্ম বা জন্মানতরবাদকে সমর্থন করে না?

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=6718

Posted by on Nov 13 2017. Filed under প্রবন্ধ, মুক্তমত. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।