প্রকৃতির প্রতিশোধ

Smiley face
পাহাড় ধসে রাঙ্গামাটির নতুনপাড়া ও শিমুলতলী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। ছবি: প্রথম আলো।

ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। তার মধ্যে বর্ষা ঋতু এখনও আসেনি। কিন্তু তার পূর্বে প্রবল বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ পাহাড় ধসে এখন পর্যন্ত জানা গেছে দেশের পাঁচ জেলাতে মারা গেছে ১৫০ জন। আহত হয়েছে অনেকে, ঘর-বাড়ী হারা হয়েছে শত শত পরিবার।সর্বোপরি ২০০৭ সালের চট্টগ্রামের পাহাড় ধসের ঘটনার পর আরো একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখলো দেশবাসী।

এবারের দুর্যোগে সব থেকে বেশী ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে দেশের সব থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য শহর রাঙ্গামাটিতে।সংবাদ পত্র মারফত জানতে পেরেছি, শুধু রাঙ্গামাটিতে ১৪৩টি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে।আমাদের বাড়ীর সীমানা জুড়েও হয়েছে পাহাড় ধস। সেখানে মারা গেছে দুই জন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী।আমার পরিবারের মা, ভাই-বোন, ভাগ্নি সবাই সৌভাগ্যবশত রক্ষা পেলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বাড়ীর।রাঙ্গামাটির সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আমি এখনও সেখানে যেতে পারিনি।

সংবাদ পত্র মারফত জানতে পারছি, যেসব পাহাড়ে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে সেসব পাহাড়েই বেশী ভূমি ধসের ঘটনা ঘটেছে।প্রত্যন্ত এলাকাতে যেসব স্থানে জনবসতি কম সেব স্থান থেকে ভূমি ধসের খবর এখনও পাওয়া যায়নি।দূর থেকে বার বার ভাবছি কেন এমন পাহাড় ধস দেখলো হাজার বছর ধরে পাহাড় ও প্রকৃতিকে ভালবেসে তার বুকে বেঁচে থাকা এই মানুষ গুলো।

জিও সায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণা থেকে জানলাম প্রধান দুটি কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। গবেষনায় বলা হয়েছে পাহাড় ধসের মূলে প্রাকৃতিক কারণ এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক কারণ হিসাবে বলা হলো, ‘পাহাড়ের ঢাল যদি এমন হয় যে ঢালের কোনো অংশে বেশি গর্ত থাকে। তখন অতিবৃষ্টিতে ভূমি ধস হতে পারে। এ ছাড়া ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং পাহাড়ের পাদদেশের নদী ও সাগরের ঢেউ থেকেও পাহাড় ধস হতে পারে। আর মনুষ্য সৃষ্ট কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড়ের গাছ পালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা, পাহাড়ে প্রাকৃতিক খাল বা ঝর্ণার গতি পরিবর্তন, পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেওয়া এবং খনি খননের কারণে পাহাড় ধস হতে পারে।

গবেষণার এই সূত্র অনুযায়ী আমি মনে করি রাঙ্গামাটির পাহাড় ধসের জন্য মানুষের কর্মকাণ্ডই হচ্ছে দায়ী।আর প্রকৃতি তার আপন গতিতে প্রতিশোধ নিয়েছে মাত্র।

এই দাবীর স্বপক্ষে দেখুন, গত কয়েক দশকের আগের আর বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলা শহরের মানুষের জীবনধারার চিত্র দেখলে দেখবেন মানুষ কতভাবে পাহাড় আর প্রকৃতির ক্ষতি করেছে।মানুষের সৃষ্ট কর্মকাণ্ডের দ্বারা পাহাড়ের পরিবেশ বার বার তার আপন নীতি হারিয়েছে।প্রচুর গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।এখন এমনও যে, রাঙ্গামাটি জেলা শহর এলাকাতে বিশ বছর বয়সী গাছও দেখা মিলে না।ঘর-বাড়ী তৈরীতে পাহাড়ী আদিবাসীদের চিরাচরিত মাচাং পদ্ধতির পরিবর্তে এখন ঘর-বাড়ী করা হচ্ছে পাহাড় কেটে ভূমির ভারসাম্য নষ্ট করে। আগে মাচাং ঘর তৈরীতে পাহাড়ের কোন ক্ষতি করা হতো না। এখন দেশের সমতলের নদীর পাড়ের ভূমি হারা সেটেলার দ্বারা পার্বত্য এলাতে সমতলের মত ঘর করতে গিয়ে তারা নির্বিচারে পাহাড় কেটে পাহাড়ের ভারসাম্য নষ্ট করে ঘর-বাড়ী করছে। আর আদিবাসী পাহাড়ীরাও তা দেখে সেসব আয়ন্ত করে মাচাং ঘর এর পরিবর্তে তাদের মত ঘর-বাড়ী বানাতে গিয়ে তারাও মহা ক্ষতি করছে পাহাড় ও প্রকৃতির।

আমি কোন বিশেষজ্ঞ নয়, তাই আমি বিশেষজ্ঞের মত কোন পরামর্শও দিতে চাই না।তবে আমেরিকান আদিবাসী নেতা ‘চিফ সিয়াটল’আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে যে চিঠি লিখেছিলেন।সেই চিঠির আলোকে আমার এই লেখা শেষ করতে চাই।

সিয়াটল সেই চিঠিতে কি সুন্দর ভাবে বলেছেন প্রকৃতি আর মানুষের মাঝের সর্ম্পকের কথা।প্রকৃতির যন্ত নিলে একে অপরে কি সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকা যায় সে কথা।

চিঠির একটা অংশে সিয়াটল লিখেছেন, ‘আমাদের সন্তানদের যা শিখিয়েছি, আপনারাও কি আমাদের সন্তানদের তা-ই শিখাবেন? আমরা শিখিয়েছি যে ধরণী আমাদের মা। এই ধরণীর কিছু হলে এর সন্তানদের সবারই তা হবে।

এবারের পাহাড় ধসের ট্রাজেডি সেই শিক্ষায় দিলো। আপন সন্তানের মত এই পাহাড় আর পরিবশকে ভালোবাসতে হবে।পাহাড় আর পাহাড়ে পরিবেশের ক্ষতি করে এখানে কেউ ঠিকতে পারবে না।পাহাড়ের বুকে বাঁচতে হলে, ঠিকে থাকতে হলে আপনাকে পাহাড়ের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতেই হবে। না হয় এই পাহাড় ও পরিবেশ বার বার আপন গতিতে তার ‘প্রতিশোধ নেবেই’।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Recommended For You

Leave a Reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।