প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান চট্টগ্রামের বৌদ্ধসমাজ

Smiley face

শিমুল বড়ুয়াঃ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যেকার সংযোগস্থল হচ্ছে চট্টগ্রাম। প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান- সমুদ্র, নদী, পাহাড়, অরণ্য, হ্রদ আর সমতল ভূমির সমন্বয়ে গড়ে উঠা ফেনী নদীর দক্ষিণপাড় থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত বৃহত্তর চট্টগ্রাম শুধু বাংলায় নয় বিশ্ব মানচিত্রেও প্রাকৃতিকভাবে একটা অনন্য সমৃদ্ধ জনপদ। ঐতিহাসিককাল থেকে চট্টগ্রামে বিদ্যমান আছে বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর। ফলে প্রাচীনকাল থেকে এই জনপদ হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি, ঘটেছে এখানে তাদের স্ব স্ব সমাজ-সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের এই অঞ্চল প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতিতেও ঋদ্ধ। এতে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংস্কৃতি হয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

buddhism_in_bangladesh

সাধারণত চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ও কক্সবাজার নিয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম গঠিত। এই বৃহত্তর চট্টগ্রামেই বাংলাদেশের সর্বাধিক বৌদ্ধ জনগণের বসবাস। এছাড়া ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, পটুয়াখালী ও বর্তমানে উত্তরবঙ্গেও আছে বৌদ্ধদের বসতভূমি। বাংলাদেশ বৌদ্ধরা সংখ্যায় স্বল্প হলেও তারা বিশ্ব বৌদ্ধধর্ম দর্শন ও সভ্যতার ইতিহাসে দুটো যুগান্তকারী মাইলফলক সৃষ্টিকারী বৌদ্ধদের উত্তর পুরুষ। প্রথমত, নানান ঘাতপ্রতিঘাতে রাজানুকূল্যের অভাবে, নিজেদের দুর্বলতা আর অদূরদর্শীতায় বৌদ্ধধর্ম দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে জন্মস্থান ভারতবর্ষ হতে বিলুপ্ত হলেও বৌদ্ধধর্ম খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে (আরাকান-বার্মার প্রভাবে) বৃহত্তর চট্টগ্রামে এখনো দেদীপ্যমান। দ্বিতীয়ত, বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলেই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের গোড়াপত্তন ঘটে বলে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের অভিমত।

শুধু বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে নয় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও ভারত উপমহাদেশে বাংলাদেশের বৌদ্ধ ইতিহাস সভ্যতা বিরাট গৌরবের কৃতিত্বের দাবিদার। বাঙালি সংস্কৃতির ভিত রচনায় বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগণকে চারটি ভাগে বিন্যস্ত করা যায় : সমতলীয় বঙালি বৌদ্ধ, পার্বত্র চট্টগ্রামের আদিবাসী বৌদ্ধ, সমতলীয় রাখাইন বৌদ্ধ ও উত্তরবঙ্গের ওঁরাও আদিবাসী বৌদ্ধ। বাংলাদেশের তথা চট্টগ্রামের বাঙালি বৌদ্ধরা চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসিন্দা। তারা সম্পূর্ণ আরাকান বংশোদ্ভূতও নয়, সুদূর ভারতের উত্তর প্রদেশের মগধ বংশোদ্ভূতও নয়। অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো তারা একটি সঙ্কর সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠী।

পালি ‘মহাবগ্গ’ নামক পিটক গ্রন্থ এবং বার্মার ধর্ম ইতিহাস গ্রন্থ ‘শাসনবংস’ মতে বার্মার তপসসু ও ভল্লিক নামক বণিকদ্বয় বুদ্ধের কছে গমন করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং বুদ্ধের আটটি কেশধাতু নিয়ে সুবর্ণভূমিতে (বার্মা) চৈত্য নির্মাণ করেন। পালি ‘দীপবংস’ ও মহাবংস’ গ্রন্থমতে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম প্রচার-প্রসারের জন্য ভিক্ষু সোন ও উত্তরকে সুবর্ণভূমিতে (বার্মা) প্রেরণ করেন। তপসসু, ভল্লিক, ভিক্ষু সোন ও উত্তর চট্টগ্রাম হয়ে সুবর্ণভূমিতে গমন করে থাকবে। কারণ ইতিহাসবিদ ড.সুনীতিভূষণ কানুনগো প্রমুখের মতে ভারতবর্ষ থেকে সুবর্ণভূমিতে গমনের এটাই ছিল তখন সহজ পথ। স্বাভাবিকভাবে ধর্মপ্রচারকরা এই সময় চট্টগ্রামে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছিলেন। তখন চট্টগ্রামের স্থানীয় আদিম জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম মৌর্যপূর্ব বা মৌর্যযুগের কোন সরাসরি প্রমাণ পাওয় যায় না। তবে সম্প্রতি ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলার উয়ারি-বটেশ্বরে খননকার্যে আবিষ্কৃত খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চমশতাব্দীর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার চক্রবর্ত্তী অনুমান করেন সমতট (কুমিল্লা) ও চট্টগ্রাম মৌর্য শাসন পৌঁছে থাকতে পারে। আবার আরাকানের প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ ‘রোজোয়াং’ সূত্রে জানা যায়, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মগধের চন্দ্রসূর্য নামক এক সামন্ত রাজ আরাকান-চট্টগ্রাম অধিকার করে রাজত্ব করেন। অনুমান করা হয় এই সময় মগদাতে বৌদ্ধ বা আরাকানি বৌদ্ধদের সাথে চট্টগ্রমের আদিম জনগোষ্ঠীর বৈবাহিক সম্পর্ক জনিত রক্ত সংমিশ্রণে চট্টগ্রামের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। ফলে চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের চেহারায়, আচার-আচরণ, রীতি-নীতিতে সংস্কৃতিতে মগধি, আরাকানি ও মঙ্গোলীয় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না চট্টগ্রামের সমতলীয় বৌদ্ধরা আরাকানি বৌদ্ধ বা মগধাগত মগ (মগধের অধভ্রংশ মগ) বৌদ্ধ বা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত বৌদ্ধ। সবিশেষ উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে মোগল শাসক কর্তৃক মগধাওয়ানী বা মগপলায়নীতে (১৬৬৬ ও ১৭৫৬ খ্রি.) আরাকানী মগ অধিবাসীরা চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে আরাকান চলে গেলেও চট্টগ্রামের বড়ুয়া তথা বাঙালি বৌদ্ধরা পালিয়ে যায়নি, কারণ তারা এতদঅঞ্চলের আদিবাসিন্দা। তদুপরি আদিম জনগোষ্ঠীর মতো সমতলীয় বড়ুয়া বৌদ্ধদের খাওয়া-দাওয়ায় কোন বাছ-বিচার নেই তথা সংস্কার নেই। আরো উল্লেখ্য, মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত জনগোষ্ঠীর দাড়ি-গোঁফ গজায় না, কিন্তু বড়ুয়া তথা বাঙালি বৌদ্ধদের দাড়ি-গোঁফ জন্মায়। এতে আমরা বলতে পারি পরবর্তীতে চট্টগ্রামের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মতো চট্টগ্রামের এইসব আদি বৌদ্ধরা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাংরা ভাষাভাষী বাঙালি বৌদ্ধে রূপান্তরিত হয়।

noviceবাংলাদেশের বাঙালি বৌদ্ধরা বড়ুয়া (সংখ্যাগরিষ্ঠ), রাজবংশী, সিংহ, সিকদার,তালুকদার, চৌধুরী ও মুৎসুদ্দী পদবী ব্যবহার করে থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় উপরোক্ত পদবীগুলো বৌদ্ধরা ব্যবহার করতে থাকে মূলত ব্রিটিশ শাসনামল থেকে। আরাকানী শাসনামলে তারা আরাকান সমাজে ব্যবহৃত পদবীও ব্যবহার করত। বৌদ্ধধর্মে কোন ধরনের বর্ণপ্রথা না থাকার কারণে বিভিন্ন শাসকের শাসনামলে বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে শাসনকার্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বিভিন্ন পদবী গ্রহণ করেছে। এখনো স্বেচ্ছায় অনেকে পদবী পরিবর্তন করে। এমনকি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এশিয়ার প্রথম ডিলিট ডিগ্রী অর্জনকরী ভারততত্ত্ববিদ প্রত্নতত্ত্ববিদ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান ড. বেণীমাধব তাঁর ‘তালুকদার’ পদবী ত্যাগ করে বহুল প্রচলিত বড়ুয়া পদবী গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলাদেশের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলায় সমতলীয় বাঙালি বৌদ্ধদের মূল বসতবাড়ি। ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে চট্টগ্রামের বৌদ্ধরা কখনো থেরবাদী (হীনযানী) বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন, কখনো মহাখানী ও তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন, কখনোবা মহাযানী বা থেরবাদী উভয় মতবাদের অনুসারী ছিলেন। বর্তমানে চট্টগ্রামের তথা বাংলাদেশের বৌদ্ধরা থেরবাদী (হীনযানী) বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম অনুসারীরা বুদ্ধ প্রবর্তিত নিয়ম-কানুন পালনে তথা আদর্শ অনুসরণে কট্টর-রক্ষণশীল, মহাযানী বৌদ্ধরা উদার ও বিশ্বজনীনÑ কট্টর নয়, অবশ্য উভয়ের মূল লক্ষ্য, নির্বাণ লাভ। বৌদ্ধ সমাজ দুই ভাবে বিভক্ত-গৃহীসমাজ ও ভিক্ষুসমাজ অর্থাৎ ভিক্ষুসংঘ। চট্টগ্রামের গৈরিক বসনধারী সংসারত্যাগী ভিক্ষুসংঘ দুইটি ধারায় বা নিকায়ে বিভক্ত-একটি হচ্ছে মহাস্থবির নিকায়, আরেকটি সংঘরাজ নিকায়। মৌলিক কোন পার্থক্য নেই, উভয় নিকায়ের ভিক্ষুসংঘ থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করেন। ভিক্ষু সংঘে নিকায়গত বিভাজন থাকলেও গৃহীসমাজের মধ্যে ধর্মীয় আচার-আচরণে রীতি-নীতিতে জন্মমৃত্যু বিবাহ অনুষ্ঠানাদিতে কোন বৈষম্য নেই। গৃহীরা উভয় নিকায়ের ভিক্ষু সংঘকে শ্রদ্ধা-বন্দনা জানায়। উভয় নিকায়ের অন্তর্ভুক্ত গৃহীরা পরস্পরের মধ্যে খাওয়া-দাওয়া ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে কোন বাধা নেই। ভিক্ষুসংঘ তথাগত মানবপুত্র বুদ্ধ প্রবর্তিত বিনয় মেনে বৌদ্ধ বিহারে বসবাস করেন।

নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালি বৌদ্ধরা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় হিন্দু- মুসলিমদের সাথে বাঙালি জাতিসত্তার এক সুতায় গাঁথা। উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধনের সভ্যতা, চারশত বছরব্যাপী পাল বৌদ্ধ রাজত্বের সমকালীন ভাষা, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, শিল্পকলা প্রভৃতি বাঙালি জাতিসত্বা তথা বাঙালি সংস্কৃতির গোড়াপত্তনের অন্যতম উপাদান। বৌদ্ধরা যে এতদঞ্চলে মর্যাদার সাথে বাস করত তার প্রমাণ ইতিহাসখ্যাত পুণ্ড্রবর্ধনের মহাস্থানগড়, ভাণু বিহার, নওগাঁও পাহাড়পুর, ময়নামতি শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, রামুর রামকোট বিহার, চট্টগ্রামের পণ্ডিত বিহার ইত্যাদি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়তুল্য বিহারে নেপাল, তিব্বত, ভুটান, বার্মা, চীন প্রভৃতি দেশের পন্ডিত ও শিক্ষার্থীরা বৌদ্ধধর্ম ও নানান বিদ্যা অর্জন ও চর্চার জন্য যাতায়াত করতেন। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে বাংলার বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন। পন্ডিতদের মতে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা বাঙালি জাতিসত্তার জনক ছিলেন। এই সময়ের অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, প্রজ্ঞাভদ্র (তিলোদা), শীলভদ্র, চন্দ্র গোমিনী, কমলশীল, নরোপা, চাটিলপা, বনরত্ন প্রমুখ বৌদ্ধ পণ্ডিতের খ্যাতি বাংলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। মৌর্যযুগে, গুপ্তযুগে, পালযুগে, খড়গবংশ-রাতবংশ-দেববংশÑ চন্দ্রবংশ আর কম্বোবংশের রাজত্বকালে সারা বাংলায় বৌদ্ধধর্ম-সংস্কৃতির বিস্তৃতি ঘটে।

The-devoteesমৌর্যযুগ থেকে শুরু করে দ্বাদশা শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালের বৌদ্ধযুগটা ছিল সমগ্র বাংলাসহ ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটা স্বর্ণযুগ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে-‘বৌদ্ধযুগ ভারত ইতিহাসের একটি প্রধান যুগ।’ এই যুগের গুরুত্ব এত বেশি যে ভারতবর্ষ তথা বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্পকলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি-অর্থনীতি সম্পর্কে জানতে হলে বৌদ্ধযুগের সাথে পরিচয় থাকতে হবে। বাংলার ইতিহাসে প্রাগ্রসর চিন্তা-চেতনায়, শিল্প-সাহিত্যের বিকাশে, আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক অগ্রগতিতে এবং বহির্দেশের সাথে রাষ্ট্রীয় সুসম্পর্ক স্থাপনে বৌদ্ধযুগের ভূমিকা ছিল অনন্য এবং গৌরবোজ্জ্বল। টেনিক পরিব্রাজকদের ভ্রমণকাহিনীতেও এসময়কার বাংলার শিক্ষা-সাংস্কৃতি-অর্থনীতির সমৃদ্ধির কথা প্রতিভাত হয়। ইতিহাসবিদ ড. আর সি মজুমদারের মতেÑ‘পালরাজাগণের চারিশত বর্ষব্যাপী রাজকাল বাঙালী জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার যুগ। ধর্মপালের রাজ্য বাঙালির জীবন প্রভাত।’ সেন বংশের আগমনে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থানে, ভিক্ষুসংঘের মধ্যে মতানৈক্য ও ধর্মের বিকৃতিকরণে, রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যহীনতায়, নিজেদের অদূরদর্শীতায়, বৌদ্ধ বিহারে বসবাসরত ভিক্ষুসংঘের সাথে গৃহীসমাজের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায়, শক্তিশালী বৌদ্ধ গৃহীসমাজের অভাবে, তৃর্কী সৈন্যদের নির্বিচার ধ্বংসলীলায় খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতক থেকে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। অনেক বৌদ্ধ চৈতন্যদেবের গৌড়িয় মত গ্রহণ করে হিন্দু সমাজের সাথে মিশে যায়। কিছু বৌদ্ধ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়। কতক বৌদ্ধ পুঁথিপত্র নিয়ে নেপালে, সিকিমে, ভুটানে, তিব্বতে পালিয়ে যায়। তখন ভারত-বাংলাদেশ থেকে বৌদ্ধধর্মের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকাটি নিবে গেলেও তার একটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর শিখা বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের বৃহÍর চট্টগ্রামে কিছুটা শাসক বৌদ্ধ আরাকানিদের সক্রিয় সহযোগিতায় বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছিল। বৌদ্ধরা সংখ্যায়-গুণে জ্ঞানে চিত্তে বিত্তে নিঃস্ব হতে হতে তার অন্তর্গত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল, তন্ত্র-মন্ত্র দেব-দেবীর পূজা ও কুসংস্কারনির্ভর বৌদ্ধধর্ম চর্চা করিছল।

ত্রয়োদশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বাঙালি বৌদ্ধদের অন্ধকার যুগ। এই সময় বাংলার সংখ্যালঘু বৌদ্ধরা যে অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে নিঃস্ব ছিল তা কোন উপাত্ত ছাড়াই বলা যায়। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য মনীষীদের গবেষণায় এবং প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনাদি আবিষ্কারে-খননকার্যে প্রমাণিত হচ্ছিল বাংলার বিলুপ্ত প্রায় বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্বের কথা, শৌর্য-বীর্যের কথা। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণে ব্রিটিশ শাসিত বাঙলায় পুনরায় সাংগঠনিক ও ব্যক্তি উদ্যোগে বৌদ্ধধর্ম-দর্শন-সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটতে থাকে। কলতাকা কেন্দ্রিক এই নবজাগরণের ঢেউ বাংলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চল চট্টগ্রামে বসবাসকারী বৌদ্ধদের হৃদয়-মনেও দোলা দিয়ে যায়। ভারতবর্ষের বৌদ্ধধর্মের ক্ষীণ দীপ শিখাটি চট্টগ্রামের বৌদ্ধরা। যেমন করে ঝড়-ঝঞ্ঝায় আগলিয়ে রেখেছিলেন, তেমনি তারা বৌদ্ধধর্ম-সমাজ-সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনেও রাখে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ব্যক্তি বা সাংগঠনিক উদ্যোগে স্বাতন্ত্র্যবোধ প্রতিষ্ঠায়, ধর্মীয় কুসংস্কার ও মিথ্যাদৃষ্টি দূর করে সমাজ-ধর্ম-সংস্কারে, থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম-সংস্কৃতি প্রচলনে-প্রসারে, গ্রন্থাগার-শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠায়, পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রচলনে, গ্রন্থ রচনায় এবং বৌদ্ধমেলা-উৎসব আয়োজনে কয়েকজন মহান ভিক্ষু ও গৃহী ব্যক্তিত্ব আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মহাত্মা চাইয়া ঠাকুর, সারমেধ মহাস্থবির, নাজির কৃষ্ণ চৌধুরী, কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবির, ডা. রামচন্দ্র বড়ুয়া, পন্ডিত ধর্মরাজ বড়ুয়া, অগ্রসার মহাস্থবির, গুণমেজু মহাস্থবির, ডা. ভগীরথ বড়ুয়া, পণ্ডিত নবরাজ বড়ুয়া, কবি সর্বানন্দ বড়ুয়া, ফুলচন্দ্র বড়ুয়া, সমন পুন্নানন্দ স্বামী, চন্দ্রজ্যোতি মহাস্থবির, কালিন্দী দেবী, পুন্নাচার ধর্মাধারী মহাস্থবির, গুণালংকার মহাস্থবির, জ্ঞানীস্বর মহাস্থবির, বংশদীপ মহাস্থবির, প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির, ড. বেণীমাধব বড়ুয়া প্রমুখ।

বাংলায় বৌদ্ধসমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতির জাগরণকে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কলকাতা ও চট্টপগ্রামে প্রতিষ্ঠিত বেশ কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং একাডেমিক প্রতিষ্ঠান। যেমন-চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি (১৮৮৭) (বর্তমানে ইহার নাম বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি), বুড্ডিস্ট টেকস্ট সোসাইটি (১৮৯২, কলকাতা প্রতিষ্ঠাতা চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান তিব্ববিশারদ রায় বাহাদুর শবরচন্দ্র দাস), মহাবোধি সোসাইটি (১৮৯১, কলকাতা প্রতিষ্ঠাতা সিংহলবাসী অনাগারিক ধর্মপাল), বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কর সভা (১৮৯২, কলকাতা, চট্টল গৌরব কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবির) ইত্যাদি। বুড্ডিস্ট টেকস্ট সোসাইটি ছাড়া বাকী সংগঠনগুলো এখনো জঙ্গল। এগুলোর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ (১৯৪৯), বৌদ্ধযুব পরিষদ (১৯৬৭), বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফাউন্ডেশন (১৯৭৯), বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন (১৯৮২), আনামা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী (১৯৮২), বাংলাদেশ বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট (১৯৮৪) প্রভৃতি সংগঠন প্রতিষ্ঠান সমাজ-সদ্ধর্মের অগ্রগতিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

‘উৎসবের দিন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-‘প্রতিদিন মানুষ দীন, একাকীÑকিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।’ বৌদ্ধদেরও নিজস্ব উৎসব, পূজাপার্বণ আছে, যার প্রাচীনত্ব সন্দেহাতীত। পূর্ণিমাকে ঘিরে বৌদ্ধ উৎসবগুলো অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ বৌদ্ধদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উৎসব হচ্ছে-বৈশাখী বা বুদ্ধ পূর্ণিমা, আষাঢ়ী পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দানোৎসব, মাঘী পূর্ণিমা, কালগুণী পূর্ণিমা, চৈত্র সংক্রান্তি ও বর্ষ বরণোৎসব। তবে বৌদ্ধধর্ম সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা খুবই কম হওয়ায় চট্টগ্রামের বাইরে বুদ্ধ পূর্ণিমা টের পাওয়া যায় সরকারি ছুটি (একদিন) থাকার কারণে। অন্যান্য উৎসবের কথা জানার কথাই ওঠে না। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বৌদ্ধসমাজের অবস্থান হওয়ায় শুধুমাত্র চট্টগ্রামবাসীরা এই উৎসবের জাঁকজমক কিছুটা অনুভব করে থাকে। তারপরও বৌদ্ধরা তাদের ধর্মীয় স্বকীয়তা বজায় রেখে নিজেদের সামর্থ্যরে ভিত্তিতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবগুলো উদযাপন করে থাকে। এইসব বৌদ্ধ উৎসব অনুষ্ঠানের ফানুস উড়ানোর সংস্কৃতিটা বর্তমানে সর্বজনীন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আবার এইসব পূর্ণিমাকে উপলক্ষ করে বৌদ্ধধর্মের প্রচার প্রসার বৌদ্ধ তীর্থ ঐতিহ্য ও স্কৃতিকে ধরে রাখার প্রত্যয়ে বিশেষ করে বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে বা খোলা মাঠে বৌদ্ধ মেলা বসে। অনেক মেলার প্রচলন ঘটে উনবিংশ শতাব্দীতে, কিছু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে অথবা তারও পরে। অনেক মেলা শুরু থেকে এখনো বর্তমান, কিছু মেলা স্মৃতি মাত্র। এখনো প্রচলিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ মেলা হচ্ছেÑমহামুনি মেলা (১৮১৪), রাউজান পরিনির্বাণ মেলা (১৯০৮), বৈদ্যপাড়া বোধিদ্রুম মেলা (১৮৭৮), ঠেগরপুনি বুড়া গোঁসাইর মেলা (১৮৫৫), ইছামতি ধাতুচৈত্য মেলা (১৮৭৭), হাইদচাকিয়া মাহমুনি মেলা (১৯১৩), ইত্যাদি। এইসব উৎসব মেলার গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হচ্ছে বুদ্ধ বা বৌদ্ধ কীর্তন পরিবেশনা। বৌদ্ধ কীর্তনকে যুগোত্তীর্ণ করে ধরে রাখার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন সংগীতাচার্য জগদানন্দ বড়ুয়ার বাবা শিক্ষাবিদ মোহন চন্দ্র বড়ুয়া। চট্টগ্রাম প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও পর্যটন কেন্দ্রেও সমৃদ্ধ, যেমন-পন্ডিত বিহার (অবশ্য চট্টগ্রামের কোথায় অবস্থিত এবং কিভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল এখনো জানা সম্ভব হয়নি), আনোয়ারা উপজেলার ঝিয়রী গ্রাম (১৯২৭ সালে ৬৬টি বৌদ্ধমূর্তি আবিষ্কৃত), রামুর রামকোট বিহার, টেকনাফ-কক্সবাজার-রামুর প্রাছীন প্যাগোডা-ক্যায়াং ও জাদি, রাঙ্গুনিয়ার বেতাগীর সাগরবুদ্ধ, মহামুনি মন্দির, চক্রশালা চৈত্য, চট্টগ্রাম শহর ও ঠৈগরপুনির বড়ুা গোঁসাই, চন্দ্রনাথ, আধিনাথ, রাঙ্গামাটির রাজবন বিহার, চিৎমরম বিহার, বান্দরবানের স্বর্ণ জাদি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার বা চৈত্য দ্বারা চট্টগ্রাম শোভিত বলে চট্টগ্রামের আরেক নাম চৈত্যগ্রাম। সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতির বিকাশে সাময়িকী তথা পত্রপত্রিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভালো সাময়িকী সমাজ তথা মানুষের অগ্রগতিতে সংগঠকের ভূমিকা পালন করে। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত উভয় বাংলার মধ্যে বৌদ্ধ অধ্যুষিত বৃহত্তর চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের প্রথম সাময়িকপত্র হচ্ছে কালিকিঙ্কর মুৎসুদ্দী সম্পাদিত ‘বৌদ্ধ বন্ধু’। ঊনিশ শতকের বাকী ১৬ বছরে আর কোন বৌদ্ধ পত্রিকা প্রকাশ পানি। কিংবা শতাব্দীতে প্রকাশিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হচ্ছে-‘বৌদ্ধ পত্রিকা (১৯০৬), ‘জগজ্জ্যোতি’ (১৯০৮), সঙ্খশক্তি (১৯২৮), ‘গৈরিকা’ (১৯৩৬), ‘কৃষ্টি’ (১৯৫৬), ‘নালন্দা’ (১৯৩৫), ‘বোধি ভারতী’ (১৯৫৩), ‘অনেমা’ (১৯৭৭), ‘বোধিবার্তা’ (১৯৯৪), ‘সৌগত’ (১৯৯৬) ‘দি ফাউন্ডেশন’ (১৯৯০) ইত্যাদি। কলকাতা থেকে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার (১৮৯২) মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত ‘জগজ্জ্যোতি’ (১৯০৮) শতবর্ষ পূর্ণ করে এখনো প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে।

স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে বৌদ্ধরা কখনো পিছিয়ে ছিল না, পরিচয় দিয়ে চলেছেন রাজনৈতিক সচেতনতার ও সংগ্রামী মানসিকতার। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে মহান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ও চলমান যে কোন প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগামে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিটা বির্তনে বৌদ্ধদের অংশগ্রহণ অতীতের মতো চট্টগ্রামেও স্পষ্ট। ব্রিটিশ বিরোধী যুগান্তর ও অনুশীলন উভয় বিপব্লী দলে বৌদ্ধ যুবকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। বাংলার স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবী বাহিনী বড়ুয়া ও বিপ্লবী নিরঞ্জন বড়ুয়া ফাঁসিকাষ্ঠে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বেশ কয়েকজন সংসার ত্যাগী বৌদ্ধ ভিক্ষু ও মহিলাও বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল। অতিরিক্ত নির্যাতনে কারাগারে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন বিপ্লবী মহেশ বড়ুয়া ও বিপ্লবী ধীরেন্দ্রলাল বড়ুয়া। এছাড়া অনেক বৌদ্ধ যুবক অসহযোগ আন্দোলনে, সত্যাগ্রহ আন্দোলনে, আজাদহিন্দ, আন্দোলনে যোগদান করে স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছিলেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ বড়–য়া। ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বৌদ্ধ যুব সমাজ, এফএফ, বিএলএফসহ বিভিন্ন গ্রুপের সদস্য হিসেবে সবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন পাক সেনাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, শহীদ হয়েছিলেন। মহান মুক্তিযোদ্ধে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করে গেছেন। এক্ষেত্রে প্রয়াত মহামান্য মহাসংঘনায়ক কর্মবীর বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো ও সংঘরাজ পণ্ডিত জ্যোতিঃপাল মহাথেরোর নাম শ্লাঘার সাথে উল্লেখযোগ্য। পণ্ডিত জ্যোতিঃপাল মহাথের বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। কর্মবীর বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো দেশের অভ্যন্তরে জনগণের জানমাল রক্ষায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় ছিলেন সদা তৎপর। দু’জনই রচনা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের উপর স্মৃতিচারণমূলক দুটো গ্রন্থ। দু’জনই তাঁদের অনন্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্যবাদী দল (এমএল) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সা. সম্পাদক কমরেড বড়–য়ার (প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী) মতো আর কোন জাতীয় রাজনীতিবিদ না থাকলেও বর্তমানে অনেক বাঙালি বৌদ্ধ বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক দলে, পেশাজীবী সংগঠনে ও ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করছেন, অনেক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেশসেবায় ভূমিকা রাখছেন।

বিংশ-একবিংশ শতাব্দীতে মরণ সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় অনেক বাঙালি বৌদ্ধের আবির্ভাব ঘটেছে, তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত কয়েকজন লেখক সাহিত্যিক শিক্ষাবিদ সংগঠক হচ্ছেন সুকুমার বড়ুয়া, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, সুব্রত বড়ুয়া, সুজন বড়ুয়া, ফণী বড়ুয়া, প্রতিভা মুৎসুদ্দী, শুদ্ধানন্দ মহাথের, ড. সুকোমল বড়ুয়া, শিমুল বড়ুয়া প্রমুখ। এছাড়া শিক্ষা, ক্রীড়া, সাংবাদিকতা, নৃত্য, গণমাধ্যম, সংগীত, নাটক, চিকিৎসা, আইন, প্রশাসনসহ নানান পেশায় কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছেন। বৌদ্ধ কৃতীসন্তান সম্পদ বড়ুয়া, পবন চৌধুরী, ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া প্রমুখ সচিব-উপসচিবসহ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে দেশসেবায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। সেবামুলক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান লাইনইজমের প্রাক্তন লায়ন গভর্নর রূপম কিশোর বড়ুয়া, প্রদীপ বড়ুয়া, মনোজ বড়ুয়া প্রমুখ সিমেন্ট-পোশাক শিল্প সেবাসহ বিভিন্ন শিল্পোদ্যোক্তার ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে বৌদ্ধরা শিক্ষাদীক্ষায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সচেনতায় এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় অনেক অগ্রসরমান। বিশেষ করে বাঙালি বৌদ্ধদের শিক্ষার হার জাতীয় শিক্ষার হারের চেয়ে অনেক বেশি, প্রায় দুই হাজারেরও অধিক বছরের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান বৌদ্ধরা বংশপরম্পরা বিশ্ব মানবসভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল উপাদান বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে বাংলাদেশের প্রবাহমান রেখেছে। সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও বুদ্ধ নির্দেশিত পথে জীবন গঠন করে ব্যক্তি জীবন যেমন সুন্দর সার্থক করছে, তেমনি সামাজিক কল্যাণেও রেখে চলেছে বলিষ্ঠ অবদান। দেশের সম্প্রীতি-সমৃদ্ধি আর বৈচিত্র্যের ধারাকে প্রবহমান রাখার প্রত্যয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী যে কোনো প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বৌদ্ধরা স্ব স্ব অবস্থান থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে ভুমিকা রেখে চলেছে। তবে বৌদ্ধরা সংখ্যায় খুব স্বল্প অথচ সংগঠন বেশি ঐক্যের অভাব, এখনো চিন্তা চেতনায় সামগ্রিক উত্থানে বদ্ধ ক্ষয়িষ্ণু সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত। প্রয়োজন সামগ্রিক ঐক্য ও জ্ঞান বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা অর্জন। বৌদ্ধরা সংগঠনগুলোকে ভাবাবেগের উচ্ছ্বাসে নয় যুক্তিবুদ্ধির বিচারে সময় অনুবর্তী গতিশীল দূরদর্শী কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। আবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোয় এমন কিছু দুর্বল ও প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা বলবৎ আছে যা দ্বারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক ও মানবাধিকার খর্ব হচ্ছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ লঙ্ঘিত হচ্ছে, সংখ্যালঘুরা দেশ ত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের ভূমিকা আরো পরিচ্ছন্ন, মানবিক, সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক এবং ইতিবাচক হওয়া উচিত। সদাশয় সরকারকে সংখ্যালঘুদের স্বকীয়তা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য রক্ষার জন্য গ্রহণ করতে হবে সময়োযোগী পদক্ষেপ।

  • লেখক : জাতীয় পর্যায়ে আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত, লেখক, গবেষক ও সংগঠক। অধ্যক্ষ, লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রী কলেজ, সীতাকু-, চট্টগ্রাম।
Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Recommended For You

Leave a Reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।