বুদ্ধত্বলাভ

রাজগৃহ ছেড়ে নদী বন পাহাড়ে ঘেরা প্রকৃতির কোলে চলে এলেন গৌতম। ঋষিদের আশ্রমে কিছুকাল অবস্থান করে বৈশালী নগরে পৌঁছলেন। এখানে ঋষি আরাড় কালামের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন, শিক্ষালাভ করলেন তাঁর দর্শন। তাঁর সমাধির সাত স্তরও অনুশীলন করলেন। কিন্তু তাঁর নিকটও গৌতমের জ্ঞান অর্জনের আকঙ্ক্ষা পূর্ণ হলো না। তিনি রাজগৃহে ফিরে গেলেন। এখানে রত্নগিরি পর্বতের গুহায় কিছুকাল অবস্থান করেন। এ গুহা ছিল বহু সাধকের আবাসস্থল। তিনি সেই সাধকদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করলেন। একদা ভিক্ষা সংগ্রহের সময়ে রাজা বিম্বিসার এই তরুণ সন্ন্যাসীকে দেখে আকৃষ্ট হলেন। ডেকে পাঠালেন রাজপুরীতে। অনুরোধ করলেন কঠোর সন্ন্যাসজীবন ত্যাগ করে রাজসভায় উচ্চ পদ গ্রহণ করতে। কিন্তু যিনি রাজসিংহাসন ছেড়ে এসেছেন, উচ্চ পদ কিংবা সম্পদ কি তাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারবে? তিনি তো রাজ ঐশ্বর্য বিসর্জন দিয়েছেন।

সমসাময়িক প্রখ্যাত শিক্ষগুরু রামপুত্র নিকট কিছুকাল ধর্মচর্চা করলেন। একসময় তিনি গুরুর সমকক্ষতা অর্জন করলেন। সেইসঙ্গে উপলব্ধি করলেন, গুরুর শিক্ষা ও সাধনপ্রণালী অনেক উচ্চমার্গের হলেও এ দ্বরা সত্যজ্ঞান লাভ সম্ভব নয়। তিনি গুরুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাজগৃহ ত্যাগ করলেন। আরাড় কালামের তিন শিষ্য-কৌণ্ডিন্য, বপ্প ও অশ্বজিৎ এবং গুরু রামপুত্র রুদ্রকের দুই শিষ্য – মহানাম ও ভদ্দিয় তাঁর সাথে যোগ দেন।

রাজগৃহ থেকে অনেক হেঁটে পৌঁছলেন উরুবেলায়। স্থানটি প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে ঘেরা। তিনি সেনানী নামে একটি গ্রামে এলেন। পাশেই গভীর বন। বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী নদী-নৈরঞ্জনা। এ-নদীর আরেক নাম ফল্গু। নির্জন প্রকৃতি গৌতমকে সব সময়ই আকৃষ্ট করত। ফলে জায়গাটি তাঁর খুব পছন্দ হলো। সিদ্ধান্ত নিলেন, দুঃখের শেষ জানার জন্য এখানেই তপস্যায় রত হবেন।

buddha_3

কঠোর সাধনায় পেরিয়ে গেল ছয়টি বৎসর। জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে গেলো গৌতমের সুন্দর দেহসৌষ্ঠব। দুর্বল শরীরে হাঁটা-চলায় অক্ষম হয়ে গেলেন। তিনি এতই দুর্বল ছিলেন যে একদিন নদীতে স্নান করতে নেমে আর উঠতে পারছিলেন না। অনেক কষ্টে পাশের একটি বড় গাছের শাখা ধরে তিনি পারে উঠতে সক্ষম হলেন। তিনি অনুধাবন করলেন, এভাবে কঠোর সাধনা তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে। দুঃখমুক্তির উপায় জানা সম্ভব হবে না। তিনি উপলব্ধি করলেন, অল্প অল্প আহার করে মধ্যপথ অবলম্বনই হবে সাধনার প্রকৃত পথ। কঠোর সাধনা বা বিলাসী জীবন, কোনোটিই দুঃখমুক্তির অনুকূল নয়। সুতরাং তিনি মধ্যম পথ অবলম্বন করলেন।

শ্রমণ গৌতমকে আহার করতে দেখে অনুগামী পাঁচজন শিষ্য কোণ্ডিন্য, বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম ও অশ্বজিৎ তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি একা হয়ে গেলেন। একদিন স্নান করে তিনি বিশাল অশ্বত্থ বৃক্ষের তলায় উপবেশন করলেন। এ সময় সুজাতা নামে সেনানী গ্রামের এক গৃহবধু শ্রমণ গৌতমকে পায়েস দান করলেন। গৌতম সুজাতার পায়েস গ্রহণ করলেন। ঐদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। পায়সান্ন খেয়ে তিনি পুনরায় ধ্যানে বসলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন, বুদ্ধত্ব লাভ না করে তিনি এই আসন থেকে উঠবেন না।

buddha2

আকাশে বৈশাখী পূর্ণিমার চাঁদ। অশ্বত্থমূলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গৌতম গভীর ধ্যানে নিমগ্ন। দুঃখ-মুক্তি অন্বেষায় তিনি সাধনারত। ধরণী প্রকম্পিত হলো। লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, ভয়ভীতি প্রভৃতি অশুভ শক্তির প্রতীক মার তাঁর এই প্রতিজ্ঞায় ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করার জন্য দলবলসহ মার নানারকম চেষ্টা করতে থাকল। তুমুল যুদ্ধ হলো। রতি, আরতি ও তৃষ্ণা – মারের এই তিন কন্যা পুষ্পধনু ও পঞ্চশর নিয়ে ধ্যানমগ্ন বোধিসত্ত্বকে আক্রমণ করল। তাঁর তপোভঙ্গ করার জন্য নানরকম অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন ও ছলনা করতে থাকল। গুরু হলো মারের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, যদি পর্বত, মেরু স্থানচ্যুত হয়, সমস্ত জগৎ শূন্যে মিশে যায়, সমস্ত নক্ষত্র, জ্যোতিষ্কও ইন্দ্রের সাথে ভূমিতে পতিত হয়, বিশ্বের সকল জীব একমত হয় এবং মহাসমুদ্র শুকিয়ে যায়, তথাপি আমাকে এই আসন থেকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারবে না।’ যুদ্ধে মার শাক্য সিংহের নিকট পরাজিত হলো। বোধিজ্ঞান লাভ করে সিদ্ধার্থ গৌতম ‘বুদ্ধ’ হলেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল পঁয়ত্রিশ বছর।

ধ্যানে বসে তিনি রাতের প্রথম প্রহরে জাতিস্মর জ্ঞান বা পূর্বজন্মের বিষয়ে জ্ঞান লাভ করলেন। রাতের দ্বিতীয় প্রহরে দিব্যচক্ষুসম্পন্ন হলেন। তৃতীয় প্রহরে জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর উৎপত্তির বিষয়ে অবগত হলেন। চার আর্যসত্য উপলব্ধি করলেন। দুঃখনিরোধের উপায় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আবিস্কার করলেন। ‘বোধি’ শব্দের অর্থ পরম জ্ঞান বা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। ‘বোধি’ অর্জন করে তিনি বুদ্ধ হয়েছিলেন। যে-অশ্বত্থ গাছে নিচে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করলেন তার নাম হেলা ‘বোধিবৃক্ষ’ বা বোধিদ্রুম। তিনি জগতে গৌতমবুদ্ধ নামে পরিচিত হন। যে-স্থানে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন তা ‘বুদ্ধ গয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

বুদ্ধত্বলাভের পরে তাঁর বোধিসত্ত্ব জীবনের সামপ্তি হয়। তিনি নির্বাণ মার্গের জ্ঞান লাভ করেন। তিনি প্রত্যক্ষ করলেন অবিদ্যা বা অজ্ঞানতাই আমাদের সকল দুঃখের কারণ। অবিদ্যার ধ্বংসের দ্বারা দুঃখের বিনাশ সম্ভব।

Buddha-Under-Bodhi-Tree

বুদ্ধত্বলাভের পরে তিনি হলেন জ্যোতির্ময়, জগতে ধ্বনিত হলো আনন্দধ্বনি। তৃষ্ণার ক্ষয় করে তিনি দুঃখকে জয় করেছেন, জন্মমৃত্যুর বন্ধন ছিন্ন করেছেন। পরবর্তী সাত দিন তিনি বোধিবৃক্ষের নিচে বজ্রাসনে বসে সুখলাভ করলেন। দ্বিতীয় সপ্তাহে ঈশান কোণে দাঁড়িয়ে বোধিবৃক্ষের দিকে অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইলেন।

তৃতীয় সপ্তাহে বোধিবৃক্ষের চারপাশে চংক্রমন কররেন। চতুর্থ সপ্তাহে রতন ঘর চৈত্যে বসে বিমুক্তি সুখ অনুভব করলেন। পঞ্চম সপ্তাহে অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষ তলে পদ্মাসনে বসে ধ্যানস্থ থাকলেন। ষষ্ঠ সপ্তাহে মুচলিন্দ বা মুচকুন্দ বৃক্ষের নিচে ধ্যানে অতিবাহিত করলেন। সপ্তম সপ্তাহ রাজায়তন বৃক্ষের নিচে ধ্যান করে অতিবাহিত করলেন। এখানে তিনি মার্গসুখ, ফলসুখ ও বিমুক্তিসুখ উপভোগ করলেন। সাত সপ্তাহ শেষে যখন বুদ্ধের ধ্যানভঙ্গ হলো তখন সে-পথ দিয়ে যাচ্ছিলিন তপসসু ও ভল্লিক নামক দুই বণিক। রাজায়তন মূলে ধ্যানবিষ্ট জ্যোতির্ময় মহাপুরুষকে দেখে তাঁরা মধু ও পিঠা দ্বারা তাঁকে পূজা করলেন। বুদ্ধ সানন্দে গ্রহণ করলেন বণিকদ্বয়ের শ্রদ্ধাদান। সুজাতার পায়সান্ন গ্রহণের উনপঞ্চাশ দিন পরে এই তাঁর প্রথম আহার। বুদ্ধ শ্রদ্ধাদান অনুমোদনকালে তাঁর অভিনব দুঃমুক্তির পথ সম্পর্কে দেশনা কররেন । কৃতার্থ বণিকদ্বয় বুদ্ধ ও ধর্মের শরণ নিলেন। বুদ্ধের প্রথম উপাসক হওয়ার গৌরব লাভ করে ধন্য হলেন তপসসু ও ভল্লিক। তখনও সঙ্ঘ গঠিত না হওয়ায় তাঁরা ‘দ্বি-বাচিক উপাসক’ নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন। বুদ্ধত্ব লাভের স্মৃতিবিজড়িত সাতটি স্থান, যথা: বোধি মূল (বোধি পালঙ্ক), অনিমেষ চৈত্য, চংক্রমন চৈত্য, রতন ঘর চৈত্য, অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষ, মুচলিন্দ মূল ও রাজায়তন বৃক্ষ প্রভৃতি স্থান বৌদ্ধশাস্ত্রে সপ্ত মহাস্থান নামে অভিহিত। বৌদ্ধরা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে এ সপ্ত মহাস্থানের উদ্দেশে বন্দনা নিবেদন করে থাকে।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=3414

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

The Buddhist Times Family

ইলা মুৎসুদ্দিইলা মুৎসুদ্দি

ইলা মুৎসুদ্দি। সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক। ই-মেইল:

পূজনীয় প্রজ্ঞেন্দ্রিয় থের এর জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা
উজ্বল বড়ুয়াউজ্বল বড়ুয়া

উজ্বল বড়ুয়া বাসু জনপ্রিয় বৌদ্ধ কলাম লেখক, দৈনিক পত্রিকার ফিচার লেখক ও সমাজকর্মী।

ধর্মান্তরিত বৌদ্ধরাই ভারতে শিক্ষা তথা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে
কনক বড়ুয়াকনক বড়ুয়া

কনক বড়ুয়া শ্রাবণ, কক্সবাজা জেলার একজন জনপ্রিয় তরুন সংবাদকর্মী ও দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর কক্সবাজার (উখিয়া) প্রতিনিধি।

রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বুদ্ধমূর্তি পরিদর্শনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী
বাপ্পা বড়ুয়াবাপ্পা বড়ুয়া

দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর ইউরোপ-আমেরিকা প্রতিনিধি এবং বৌদ্ধ নবজাগরণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক সাধারন সম্পাদক ।

১০ মে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্‌যাপন হবে জাতিসংঘের সদর দফতরে
সুপ্রিয় চাকমা শুভসুপ্রিয় চাকমা শুভ

সুপ্রিয় চাকমা শুভ তরুণ মেধাবী মিডিয়া কর্মী এবং দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর রাঙ্গামাটি জেলা প্রতিনিধি।

লংগদু বিপর্যয় ত্রাণ সহায়তা সমন্বয় কমিটি’র উদ্যোগে ২২৪ টি পরিবারে ত্রাণ বিতরণ

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 42 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya