বুদ্ধমূর্তির ইতিহাস, ক্রমবিকাশ ও প্রভাব

Smiley face

ডক্টর প্রণব কুমার বড়ুয়াঃ বৌদ্ধ শাস্ত্র পাঠে জানা যায় রাজা প্রসেনজিতৎ বুদ্ধকে প্রশ্ন করেছিলেন- ভগবান, আপনার অবর্তমানে কাকে পূজা করলে আপনার পূজা হবে। বুদ্ধ জবাবে বলেছিলেন- আমার অবর্তমানে বোধিবৃক্ষকে পূজা করলে আমার পূজা হবে। এই প্রশ্নের কারণ হলো বুদ্ধ তার মূর্তি নির্মাণের অনুমতি দেননি এমনকী তার মৃত্যুর পাঁচশত বছরব্যাপী সময়ের মধ্যে বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হয়নি। জানা যায়, বুদ্ধের তিনমাসকাল ত্রয়ত্রিশ স্বর্গে মাতৃদেবীকে এবং দেবতাগণকে সদ্ধর্ম দেশনার সময় অনুপস্থিতিকালে রাজা প্রসেনজিৎ একটি চন্দনকাঠের বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করিয়েছিলেন। ঐ মূর্তি বুদ্ধের আগমনের সাথে সাথে সরিয়ে নেয়া হয়। কেউ বলেন, ঐ মূর্তি চীনে সংরক্ষিত আছে আর কেউ বলেন ঐ স্মৃতি জাগানো বৌদ্ধ বিহারে আজও সংরক্ষিত আছে। এটা ইতিহাস হলেও ঐতিহাসিক কষ্টিপাথরে যাচাই করা সত্য নহে।

এই দীর্ঘ ৫০০ বছর বিভিন্ন প্রতীকে বুদ্ধের অস্তিত্বকে বোঝানো হয়েছে। সেগুলি নিম্নরুপ-

১) হাতি- বুদ্ধের মাতৃগর্ভে অভিসন্ধি গ্রহণ

২) অশ্ব- সংসার ত্যাগের প্রতীক

৩) বোধিবৃক্ষ- বুদ্ধত্বলাভের প্রতীক

৪) ধর্মচক্র- সারনাথে প্রথম ধর্মদেশনার প্রতীক

৫) স্তুপ (চৈত্য)- মহাপরিনির্বাণের প্রতীক

সম্প্রাট কনিষ্কের আমলে মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রকৃষ্ট বিকাশে গান্ধার শিল্পেই সর্বপ্রথম বুদ্ধমূর্তির নির্মাণ শুরু হয়। গান্ধারে (পাকিস্তান)-গ্রিক, রোমান, পারসিক ও ভারতীয় শিল্পের মিশ্রণে সৃষ্টি হয় ঐতিহাসিক গান্ধার শিল্পকলা। এই গান্ধার ভাস্কর্যের অনুপম উদাহরণ গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। বলা প্রয়োজন, সমসাময়িককালে মথুরা ও অমরাবতীতেও বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রচীন ভারতে গান্ধার ছাড়াও অমরাবতী ও মথুরায় ভাস্কর্য শিল্প সমান গৌরবে বিরাজমান ছিল।

সম্রাট অশোকের সময় বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হয়নি তার পরবর্তীকালে কুশান, গুপ্তঃ কান্ব ও শাতবাহন যুগে প্রচুর বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হয়। বাংলায় পালযুগেও বৌদ্ধভাস্কর্য উন্নত ছিল সে সময় এদেশে উন্নত বুদ্ধমূর্তি তৈরি হয়েছিল। পালযুগে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের নানাবিধ বিবর্তন শুরু হয়- তন্মধ্যে মন্ত্রযান, বজ্রযান, সহজযান, কালচক্রযান শাখার উদ্ভব হয়। সে সময় বুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি তৈরী হয়।

বুদ্ধমূর্তিগুলো প্রধানত তিনভাগে বিভক্ত-যথা স্থানক (দণ্ডায়মান), আসন (বসা অবস্থা), শায়িত (শোয়া অবস্থা), এই শায়িত মূর্তিগুলিই হলো মহাপরিনির্বাণ মূর্তি। মূর্তিগুলির আবার বিভিন্ন মুদ্রা আছে, যথা অভয় মুদ্রা, ধর্মচক্র মুদ্রা, বরদা মুদ্রা, ভূমিস্পর্শ মুদ্রা, ধ্যানী মুদ্রা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে ভূমিস্পর্শ মুদ্রার মূর্তি বেশী। এখানে স্থানক মুদ্রা অতি কম। ইদানিং রাজধানী ঢাকায় ৪৮ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এক দণ্ডায়মান বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হয়েছে-থাইরাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং থাই ও বাংলাদেশের বৌদ্ধ নর-নারীর সহযোগিতায় এ মূর্তি নির্মাণে থাইল্যান্ডের ফ্রা বুংসুং উপসাথে এবং বাংলাদেশের শ্রদ্ধেয় শুদ্ধানন্দ মহাথের মহোদয় আসনের সামনে বসে নির্মাণের কাজ পরিচালনা করেছিলেন। মূলতঃ তারাই এ মুর্তির রূপকার।

উল্লেখ্য যে, মূর্তির এক এক মুদ্রার এক এক বৈশিষ্ট্য বিদ্যামান। এই মুদ্রাগুলি বুদ্ধের জীবনের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। ধরা যাক ভূমিস্পর্শ মুদ্রার কথা। এর পেছনের ঘটনা হলো; গৌতম যখন উরুবেলায় বোধিবৃক্ষের নীচে বসে দুঃখমুক্তির পথ অন্বেশণ সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন তখন মারগণ তাকে সে আসন থেকে টলাতে অসম্ভব প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। গৌতমের বৌধিলাভের অর্থ হলো পৃথিবীতে ধর্ম ও সত্যের ন্যায় ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া। জনগণের দুর্ভোগের অবসান, সেজন্য পাপের প্রতীক, অধর্মের রাজা মার চায় তিনি যেন বোধিজ্ঞান লাভ করতে না পারেন। মারের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি সশরীরে বুদ্ধের সামনে আসেন এবং উভয়ের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়। প্রসঙ্গক্রমে কে কত দান দিয়েছেন সে বিষয়টি চলে আসে। মার বলেন- আমার দানের সাক্ষী আমার সৈন্যরা, তখন সৈন্যরা হ্যাঁ হ্যাঁ বলে সমর্থন জানায়। গৈতম বলেন আমি শুধু এ জন্মে নয়, জন্ম জন্মান্তর বহু দান দিয়েছি যা তোমার চেয়ে অনেক অনেক বেশী। মারের প্রশ্ন, তোমার সে সমস্ত দানের সাক্ষী কে? গৈতম ভূমিস্পর্শ করে উত্তর দেন, আমার সাক্ষী এই পৃথিবী। তখন ধরনীতে ভূ-কম্পন শুরু হয়, মার ও তার সৈন্যরা স্থির থাকতে পারল না-তারা ভীত হয় এবং পরাস্ত হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীক হলো ভূমিস্পর্শ মুদ্রা। পৃথিবীতে ভূমিস্পর্শ মুদ্রার বুদ্ধমুর্তির সংখ্যা বেশি। উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ ভাস্কর্য সম্পর্কে ইংরেজীতে ও বাংলায় বহু গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে। আগ্রহী পাঠকেরা সেগুলি পড়লে বুদ্ধমূর্তির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আরও ব্যাপকভাবে জানতে পারবেন।

প্রাচীন বাংলাদেশে পাল আমলে কালজয়ী বহু বুদ্ধমূর্তি তৈরী হয়েছিল। কালের বিবর্তনে পাল যুগের অবসানের পর বিষয়গুলি ধ্বংসের সাথে সাথে সেগুলিও মাটির নীচে চাপা পড়ে যায়। সে সময় কয়েকজন খ্যাতিমান ভাস্কর ছিলেন তন্মধ্যে বিটপাল ও ধীমানপাল উল্লেখযোগ্য। উনিশ শতকে বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণের সাথে সাথে বিহারে বিহারে বুদ্ধমূর্তি প্রয়োজন হয়ে পড়ে- সে সময় কিছু হিন্দু ভাস্করেরা বুদ্ধমূর্তি নির্মাণে বিরাট ভূমিকা পালন করে। আরাকান চট্টগ্রামের সন্নিকটে হওয়ায় কিছু কিছু বুদ্ধমূর্তি সেখান থেকে এদেশে আসে। বর্তমানে থাইল্যান্ড থেকে বহু বুদ্ধমূর্তি এদেশে এসেছে। এর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির অবদান গৌরবের। সিংহল থেক  কিছু কিছু মূর্তি আনা হয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ ভাস্কর তেমন নেই। তবে জানা যায় কয়েকজন ভাস্কর ইতিমধ্যে প্রশংসা অর্জন করেছে। দুই একজন কৃতি ভাস্কর মারমা সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায়। বাংলাদেশের বৌদ্ধদের এদিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, এককালে এদেশের প্রচুর বৌদ্ধদেব-দেবীর মূর্তি তৈরী হয়েছিল এগুলো মাহাযানী প্রভাবের ফল। এভাবেই বৌদ্ধ দেবায়তন গড়ে উঠেছিল। তখনও চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান- জাপান প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধ বিহারে বুদ্ধছাড়াও অন্যান্য দেব দেবীর মূর্তি লক্ষ্য করা যায়। প্রচুর বোধিসত্ত্ব মূর্তি আছে, চারি লোকপাল দেবতার মূর্তি আছে। মূর্তিগুলির মধ্যে প্রজ্ঞাপারমিতা, মঞ্জুশ্রী, তারা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে এসব মূর্তি বৌদ্ধ বিহারে এখন দেখা যায় না।

বুদ্ধমূর্তি হল বৌদ্ধজগতের ঐক্যের প্রতীক। যখনই কোন বৌদ্ধ বিশ্বের যেকোন স্থানে বুদ্ধমূর্তির সামনে আসেন তখনই সে মাথা নত করে তাকে বন্দনা জানায়- কি থেরবাদী? কি মহাযানী? বিশ্বের সমগ্র বৌদ্ধদের মধ্যে বুদ্ধের করুণাঘন মূর্তি মৈত্রী, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হয়ে বৌদ্ধবিশ্বকে একত্রিত করেছে। বুদ্ধমূর্ত মানুষকে মানবতাবাদী কর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং ত্যাগ ও সেবার মাধ্যমে বহুজন হিতায় বহুজন সুখায় আত্মনিয়োগের বিরাট প্রেরণা জোগায়।

বুদ্ধগয়ার বুদ্ধমূর্তি অনুপম এবং ভাস্কর্য শৈলী আসাধারণ। এই বুদ্ধমূর্তির সামনে এলে মাথা নত হয়ে যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূর্তিপূজার বিরোধী ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র ছিলেন। তিনি দুবার বুদ্ধগয়ায় গিয়েছিলেন। তিনি নিজে বলেছেন, তাঁর জীবনে একবার মাত্রই মূর্তির সম্মুখে প্রণাম নিবেদনের প্রেরণা জেগেছিল এবং তা গয়াতে বুদ্ধমূর্তি দর্শন করেই তাঁর এই ভাবোদয় হয়। রবীন্দ্রনাথ একমাত্র বুদ্ধমূর্তির সামনে মাথা নত করেন। এ প্রসঙ্গে শ্রী কৃষ্ণ কৃপালনীর উক্তি স্মরণীয়। তিনি Viswa Bharati quarterly, April 1943 সংখ্যায় ১৭৯ পৃষ্টায় লিখেছেন- Only once in his life said Rabindranath did he feel like prostrating himself before an image. And that was when he saw the Buddha at Gaya.  মহিলাদের স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের ১২৪ পৃষ্টায় শ্রীমতী অমিয়া বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন- “একদিন তিনি অন্যের অজ্ঞাতসারে নিশিদ্ধ সময়েই যান মন্দিরে (বুদ্ধগয়ার মন্দিরে) এবং ভেজানো দরজা হঠাৎ উন্মুক্ত করে দেখতে পান উচ্চ বেদিতে উপবিষ্ট বিরাট বুদ্ধমূর্তির সম্মুখে দণ্ডায়মান কবিগুরুর ধ্যানগম্ভীর নিশ্চল প্রতিমূর্তি, দুই চক্ষে দরবিগলিত আশ্রুধারা।“

জানা যায়, বুদ্ধগয়া থেকে ফিরে এসে রবীন্দ্রনাথ মস্তক মুণ্ডন করেছিলেন। তখন কবির মনে বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়েছিল।

 

(চলমাম………)

লেখকঃ  ডক্টর প্রণব কুমার বড়ুয়া লব্দ প্রতিষ্ঠিত লেখক-গবেষক-সংগঠক-বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের মহাসচিব

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=6574

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Oct 23 2017. Filed under প্রবন্ধ. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।