বৌদ্ধধর্মের উপর হিন্দু খড়গ; একটি চলমান যুগ পরিক্রমা

0 Posted by - July 17, 2017 - প্রবন্ধ, মুক্তমত
Smiley face

 

বৌদ্ধধর্মের উপর হিন্দু খড়গঃ ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধদের ঠিকে থাকার হাজার বছরের ইতিহাস বড়ই করুণ। বার বার বিধর্মীদের আক্রমণ আর অত্যাচারের শিকার হয়েছে। হিন্দু ও মুসলিম শাসক দ্বারা বার বার অত্যাচার আর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধধর্মাবল্বীরা।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ভারতবর্ষে মুসলিমদের আবির্ভাবের আগে থেকেই বৌদ্ধরা ক্ষমতাশালী হিন্দুদের প্রতাপে ছিলেন একেবারে কোণঠাসা।

৭ম শতাব্দীর গৌড়ের শাসক হিন্দু শৈব রাজা শশাঙ্ক মহামানব সিদ্ধার্থ গৌতমের বুদ্ধত্বলাভের পবিত্র স্থান গয়ার বোধি বৃক্ষকে ধ্বংস করেছিলেন। মহাবোধি বিহারে থাকা বুদ্ধ প্রতিকৃতি সরিয়ে তার জায়গাতে শিবের প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। আরেক শৈব হিন্দু রাজা মিহিরকুল ১৫০০ বৌদ্ধ তীর্থস্থান সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছিলেন। হিন্দু শৈব রাজা তরামন কৌসম্বিতে থাকা বৌদ্ধ মঠ ঘষিতরাম ধ্বংস করেছিলেন।

এভাবে হিন্দুদের দ্বারা একের পর এক বৌদ্ধ স্থাপনাগুলোর ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধদের নির্মূল হওয়াকে ত্বরান্বিত করে হিন্দু শাসকেরা। বুদ্ধগয়া মহাবোধি বিহারকে জোর করে শিব মন্দিরে পরিণত করে তারা। অযোধ্যার অনেক হিন্দু তীর্থস্থান, যেমন সবরীমালা, বদ্রীনাথ কিংবা পুরীর মত প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ্য মন্দির আদতে একসময় ছিল বৌদ্ধ মন্দির।”

ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ নিয়ে গবেষণা করা শ্রী নরেশ কুমার মনে করেন, বৌদ্ধধর্মের বিরোধিতা ও একইসাথে ক্ষয়িষ্ণু ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যবাদের পুনর্স্থাপনের জন্যে, ব্রাহ্মণ পুনর্জাগরণীরা তিন ধাপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন।

প্রথম ধাপে তারা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ঘৃণা আর অত্যাচারের অভিযান শুরু করে। এরপরে তারা বৌদ্ধ ধর্মের ভালো দিকগুলো আত্মস্থ করে নেয় যাতে করে সহজ সরল সাধারণ বৌদ্ধদের মন জয় করতে পারে।

হিন্দুদের বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস প্রকল্পের শেষধাপে – ‘গৌতম বুদ্ধ হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর আরেকটি অবতার ছাড়া আর কিছুই নন’– এই ধারণা চালু করে তা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে বুদ্ধকে ব্রাহ্মণ্যবাদের দেবতার মন্দিরের অগুন্তি ঈশ্বরের সামান্য একটিমাত্র-তে পরিণত করা ঘৃণ্য চেষ্টা চালায় হিন্দু ব্রাহ্মণ্যরা।

নীলেশ কুমার বলেন, “বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে চলা এই নির্মূলাভিযানকে বৈধতা দিতে ব্রাহ্মণ্য লেখাগুলোতে বৌদ্ধদের প্রচণ্ডভাবে তিরস্কার করা হয়। মনুসংহিতায় মনু বলেন, “কেউ যদি বুদ্ধকে স্পর্শ করে  তবে সে স্নান করে নিজেকে শুচি-শুদ্ধ করে নেবে।” অপরাকা তার গ্রন্থে একই ধরণের আদেশ দেন। ব্রাদ্ধ হরিত ঘোষণা করেন যে বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করাই পাপ, যা কেবল আচারিক স্নানের মাধ্যমে স্খলিত হতে পারে। এমনকি সাধারণ জনগণের জন্যে লেখা নাটিকা কিংবা পুথিগুলোতেও ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা বুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘৃণার অর্গল ছড়িয়েছেন। প্রাচীন নাটিকা ‘মৃচ্ছাকথিকা’তে (পর্ব ৭), নায়ক চারুদত্ত এক বৌদ্ধ সন্তকে হেঁটে আসতে দেখে, বন্ধু মৈত্রীয়কে ক্রোধক্তিতে বলেন – ‘আহ্! কী অশুভ দৃশ্য – এক বৌদ্ধ সন্ত দেখছি আমাদের দিকেই আসছে।’

ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুজ্জীবনের পুরোধা শঙ্করাচার্য বৌদ্ধবাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড নিন্দামূলক কথার মাধ্যমে বৌদ্ধদের মনে সীমাহীন ভীতির সঞ্চার করেছিলেন … পুরানের অনেক রচয়িতাও মিথ্যা কলঙ্ক, অপবাদ, চরিত্রহরণের মাধ্যমে ঘৃণার এই পরম্পরা অব্যাহত রাখেন। এমনকি বিপন্ন সময়েও কোনো বৌদ্ধের বাড়িতে প্রবেশ করাকে ব্রাহ্মণদের জন্যে মহাপাপ হিসেবে তাদের ধর্মগ্রন্থ নারদীয় পুরানে আজ্ঞায়িত করা হয়। বিষ্ণু পুরানে বৌদ্ধদের মহা-মোহ হিসেবে উপাধিত করা হয়। এতে ‘বৌদ্ধদের সাথে কথা বলার পাপ’-কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, “যারা এমনকি বৌদ্ধ ধর্ম গুরুদের সাথে কথাও বলবে – তাদের নরকে যেতে হবে।”

কুশিনগর মহামানব গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের স্থান যে কারণে এটি বৌদ্ধদের কাছে পবিত্র। এই কারণে ব্রাহ্মণরা এই কুৎসা রটায় যে এই শহরে মৃত্যু হলে সে সরাসরি নরকে চলে যাবে কিংবা পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মাবে – কিন্তু ব্রাহ্মণীয় পবিত্র নগর কাশিতে মৃত্যু হলে সে সরাসরি স্বর্গে চলে যাবে।

হিউয়েন সাং এর বাংলা ভ্রমণকালে গোঁড়া হিন্দু শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার শাসক। তিনি শশাঙ্ককে একজন “বিষাক্ত গৌড় সাপ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন – যিনি বাংলার বৌদ্ধ স্তুপ -মন্দিরগুলো ধ্বংস করেন আর তার রাজ্যের একেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মাথার জন্যে একশ স্বর্ণমুদ্রা করে পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। হিউয়েন সাং-সহ অনেক ঐতিহাসিক দলিল সূত্র বলে থানেসরের বৌদ্ধ রাজা রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেছিলেন শশাঙ্ক। হিউয়েন সাং লিখেছেন, বোধ গোয়ার বোধি বৃক্ষ কাটা ছাড়াও ওখানকার বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকে শিবলিঙ্গ দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছিলেন বর্বব হিন্দু শাসক শশাঙ্ক।

বৌদ্ধধর্মের উপর হিন্দু খড়গ ও বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘঃ এই লিখাটি লেখার আগে (১১জুন২০১৭) হঠাৎ মনে হলো বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘের ফেইসবুক প্রোফাইল (www.facebook.com/runa.barua) একবার ঘুরে আসি। সে কারণে ভিক্ষুণী সংঘের ফেইসবুক প্রোফাইলে ঢু মারলাম।মাউসের কার্সর নিচে টেনে প্রথম দুটি স্ট্যাটাস এর পর তৃতীয় স্ট্যাটাস দেখে ভাল লাগেলো।স্ট্যাসটি আমি দেখার ঠিক ১৯ ঘন্টা আগে করা হয়ছে। স্ট্যাসে শুটিং এর এক ছবি সহকারে ধম্মপদের একটি বাণী ‘‘ভালো বা সমমনা সঙ্গী না পেলে একাকী ভ্রমণ উত্তম। মূর্খ সংসর্গ সবসময় বর্জনীয়। _ধম্মপদ”।

বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘের বর্তমান সমস্যাটা এখানেই। ‘‘ভালো বা সমমনা সঙ্গী না পেলে একাকী ভ্রমণ উত্তম। মূর্খ সংসর্গ সবসময় বর্জনীয়” মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধের এই বাণী অন্যকে ভাষণ করলেও ভিক্ষুণী সংঘ নিজেরা আয়ত্ত করতে সম্পূর্ণরুপে ব্যার্থ।

সপ্তম শতাব্দীতে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্মকে বিলুপ্ত করার জন্য হিন্দু শাসক ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যে তিন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল ঠিক তেমন তা-ই দেখা যচ্ছে চন্দন রিমু, জয়দেব কর, শরণ শাওনদের মত মুক্তমনার মুখোশধারী হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীতের লেখনি আর আচরণে। আর বাংলার সাথে মিরজাফর যেমন ছিলেন বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘও এখন তেমন করছে বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ সমাজের সাথে।

সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মকে বিলুপ্ত করার জন্য হিন্দু শাসক ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল বৌদ্ধ ধর্মের ভালো দিকগুলো আত্মস্থ করে সহজ-সরল সাধারণ বৌদ্ধদের মন জয় করা।ঠিক সেই পরিকল্পনাতে এখন চন্দন রিমু, জয়দেব কর, শরণ শাওনদের মত মুখোশধারী হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধের সার্বজনীন নন্দিত ‘‘কালাম সুত্র, নারী-পুরুষের সমান অধিকার,বৌদ্ধধর্মের বাক স্বাধীনতা’’ এমন সব বুদ্ধে মহান শিক্ষাকে ব্যবহার করে বৌদ্ধদের বিভ্রান্ত ও বৌদ্ধধর্মকে চরম বিতর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সবই করছে বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘের ঘাড়ে বসে। ভিক্ষুণী সংঘের মুখপত্র ‘গৌতমী’ সাময়িকি ব্যবহার করে।

চন্দন রিমু, জয়দেব কর, শরণ শাওনদের লেখনিতে বৌদ্ধদের পরম শ্রদ্ধার পাত্র ভিক্ষু বিদ্বেষী, বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন বিকৃত লেখা প্রকাশ করে চলছে।তারা বুদ্ধের জন্মান্তরবাদকে অস্বীকার করার মত সাহস দেখাচ্ছে।তাদের লেখনিতে কোন ভিক্ষু প্রতি উত্তর লিখলে ভিক্ষুদের কটু কথায় চরম অপমান করছে।ভিক্ষুদের প্রতি স্বাভাবিক কথা বলা বা সৌজন্যতার ধারে কাছেও এরা নেই। ভিক্ষুদেরকে সর্বক্ষেত্রেই নানা গালমন্দ কূৎসা করতে দ্বিধা করছে না। ভিক্ষুদের তুই-তোর এরূপ নানা উপহাস ব্যঙ্গ ইত্যাদি তাদের কাছে নিত্য স্বভাবিক ব্যাপার। ভিক্ষুদের টিকে থাকার জন্য কারো ‘পা’ ধরার পরামর্শ দেয় এসব হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীরা।

ইতিহাসের পাতার সাথে যাচাই করলে তাই তো মনে হয়,এই সবই হচ্ছে সেই সপ্তম শতকের হিন্দু বর্বর শাসক ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সেই তিন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।

এরা জানে একটি সমাজ বা জাতিকে ধ্বংস করতে হলে কি করতে হয়।তাই এইসব ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ব্যাপারে ভিক্ষুণী সংঘ যদি এখনও সজাগ না হয় তবে সে সময় আর বেশী দূরের নয় যখন বাংলাদেশ ভিক্ষুণী সংঘ তাদের শুভানুধ্যায়ীদের হারিয়ে আস্তাকুড়ে পরে থাকবে। সাথে সজাগ হতে হবে বৌদ্ধ তরুণদের।

সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। খুবই পরিচিত,বহু শ্রুত একটি বাক্য। খুব সহজ এবং ছোট বাক্য হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশী দুর্লভ মানব জীবনের জন্য। সে কথা আজকে ভিক্ষুণী সংঘ তাদের ফেইসবুক স্ট্যাটাসেও ধম্মপদের একটি বাণী দ্বারা স্মরণ করেছে। কাজেই আর বলার অপেক্ষা রাখে না, মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধ সৎ সঙ্গ ব্যাপারে কতোটা গুরুত্ব দিয়েছেন।

জয়তু বুদ্ধ শাসনম….বুদ্ধের শাসন চির জীবি হোক, জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

No comments

Leave a reply

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।