সতর্ক হোন, ত্রিপিটক বিকৃতি রোধ করুন:

যুক্তিবাদ নাকি ভণ্ডামি?

Smiley face

ইদানীং একদল বৌদ্ধদের পাওয়া যাচ্ছে যারা বুদ্ধের কালাম সূত্রের নাম দিয়ে ত্রিপিটকের বিকৃতি শুরু করেছে। বুদ্ধের ভাষিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা ফেইসবুকে নানা প্রশ্নের মাধ্যমে ত্রিপিটককে বিকৃত/বিতর্কিত করতে চায়। তারা যে কোন কিছু লিখে অপেক্ষায় থাকে কেউ উত্তর দিচ্ছে কি না তার জন্য। যখন কেউ একটা প্রত্যুত্তর দেয় তখন সাথে সাথে ৪/৫ জন মিলে তাকে একের পর এক যৌক্তিক/অযৌক্তিক/প্রাসঙ্গিক/অপ্রসাঙ্গিক প্রশ্ন করতেই থাকে যেন ঐ ব্যক্তি বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়।

তাদের সাথে যুক্তিতর্কে কোন বিষয় নিয়ে যখন ত্রিপিটক থেকে রেফারেন্স দেওয়া হয় তখন তারা প্রশ্ন তোলে ত্রিপিটকের কথাগুলো কতটুকু সত্যি? এবং সেই যুক্তিকে প্রমাণ করতে গিয়ে তারা উল্লেখ করেন ত্রিপিটক লিখিত হয়েছে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের অনেক পরে। আর তাই সেখানে ভিক্ষুরা মনগড়া কথা যোগ করেছে, নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য।

আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কথাগুলো সত্যই মনে হবে। কারণ আসলেই তো ত্রিপিটক লিখিত হয়েছে অনেক পরে। আর তাই তাদের যুক্তি আপনার মনকে দ্বিধায় ফেলে দেবে আর স্বভাবতই আপনি সেই কথাগুলো বিশ্বাস করে ফেলতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা কি আপনার জানতে হবে, ইতিহাস জানতে হবে।

ইতিহাস বলে প্রথম সংগীতিতে ৫০০জন সবাই অর্হৎ ছিলেন। আনন্দ ভান্তে পর্যন্ত অর্হত্ত্বফল লাভ করেই সংগীতিতে অংশগ্রহণের যোগ্য হয়েছিলেন। প্রথম সংগীতিতে যা সংগৃহীত হয়েছিল পরবর্তীতে সেসবই রক্ষিত হয় পরম্পরায়। এখানে প্রশ্ন তুলবে তারা পরম্পরায় রক্ষা করতে গিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আপনার চিন্তা করতে হবে পরম্পরা বলতে ওখানে কারা ছিলেন। যারা রক্ষা করেছিলেন তাদের মধ্যেও অনেক অর্হৎ ভান্তে ছিলেন। দ্বিতীয় সংগীতির ইতিহাস দেখুন দেখবেন ওখানে সাতশত জন প্রতিসম্ভিদাপ্রাপ্ত অর্হৎ অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

তৃতীয় সংগীতিতে দেখুন সেখানেও পাবেন সংঘের নায়ক ছিলেন মোগ্গলিপুত্র তিষ্য ভান্তে যিনি প্রতিসম্ভিদাপ্রাপ্ত অর্হৎ ছিলেন। মূলত তখন থেকেই ত্রিপিটক লিপিবদ্ধ করে রাখা শুরু হয়। বাকী সংগীতি গুলোতে খুব বেশী পরিবর্তন হয় নি। আর তা-ই চলে আসছে পরম্পরায়। এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন অর্হৎ ভান্তেরা কি ত্রিপিটক বিকৃত করেছিলেন? ত্রিপিটকে বুদ্ধ বলেন নাই এমন কিছু যুক্ত করেছিলেন? কিংবা অন্যের উপর কর্তৃত্ব ফলানোর জন্য মনগড়া বিষয় যুক্ত করেছিলেন? অর্হৎ এর কি মান, দ্বেষ থাকে?

তারা আরেকটি জায়গায় পরাস্ত করতে চায়, তা হচ্ছে আধ্যাত্মিকতা। তারা বলে নির্বাণ কি দেখাতে পারবেন? অর্হৎ কি দেখাতে পারবেন? ৩১লোকভূমি প্রমাণ দিতে পারবেন? আপনি দেখেছেন? ইত্যাদি। প্রিয় পাঠক, আপনি এখানেও দ্বিধায় পড়বেন তাদের সাথে একমত হতে চাইবেন।

কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি বুদ্ধের দেশিত ধর্ম অনুসারে বিদর্শন চর্চা করেছেন? ১ম ধ্যান, ২য় ধ্যান …. চতুর্থ ধ্যান কখনো লাভ করেছেন? যতক্ষণ এসব লাভ করতে না পারবেন ততক্ষণ আপনার এসব অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে অনুশীলন দ্বারা এসব অর্জন তো অসম্ভব নয়। কিন্তু এসব দেখা যায় না, আর হাতে কলমে তাদের দেখাতেও পারবেন না তাই তারা এটা নিয়ে হাস্যরস করবে আপনাকে পরাস্ত করবে।

মূলত, এটি বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশ নয়, তাই ওভাবে হয়তো হাতে কলমে দেখাতে পারবেন না। কিন্তু বৌদ্ধ প্রতিরূপ মায়ানমারে দেখুন। শুধুমাত্র একজন অর্হৎ মোগোক স্যাদো ভান্তের জীবনী পড়ুন সব স্পষ্ঠ হবে। ভান্তে যে অর্হৎ ছিলেন তেমন কেউ-ই জানতেন না। দাহক্রিয়ার ধাতু প্রাপ্তি-ই প্রমাণ করে দেয় তিনি অর্হৎ ছিলেন। এখন তারা অর্হৎ থেকে আসলেই ধাতু পাওয়া যায় কি না তাও বলবে সেই কালাম সূত্রের নাম ধরে। কিন্তু পুরো মায়ানমারবাসী জানে পুজা করে, পুজ্য মোগোক স্যাদো ভান্তের সেই ধাতুসমূহকে। একটু খবর নিন প্রমাণ পাবেন।

কালাম সূত্র অন্ধ হতে শিক্ষা দেয় না, স্বাধীনতার কথা বলে। জানার স্বাধীনতার কথা। তাই বলে স্বাধীনতার নাম ধরে মদ খেয়ে রাস্তায় মাতলামি করে ড্রাইভিং করবেন আর মানুষ মারবেন তা হতে পারে না। বুদ্ধ এস, দেখ বলেছেন। এই দেখা কেবল বই পড়া, আর দু লাইন যুক্তি বের করা, প্রশ্ন/পাল্টা প্রশ্ন করা নয়। এই দেখা যথার্থভাবে দেখা, বিদর্শন চর্চার মাধ্যমে দেখা।

আর তাই কেউ দুলাইন পড়ে যদি বার বার প্রশ্ন আর যুক্তি দেখায়, ত্রিপিটকের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন বুঝে নেবেন নিশ্চয় এসব বলে স্বার্থসিদ্ধির পায়তারা করছে তারা। ডিম আগে না মুরগী আগে? আমগাছ আগে না আম আগে এমন প্রশ্ন দিয়ে হয়তো আপনাকে যে কেউ বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতেই পারে তাই বলে তাতে মোহিত না হয়ে ত্রিপিটক পড়ুন। শ্রদ্ধা সহকারে পড়ুন। আর তা বাস্তবে মিলান দেখবেন সব ঠিকই মিলে যাচ্ছ।

অন্যের কথায় মশগুল হওয়ার দরকার নাই। বুদ্ধ মহাজ্ঞানী ছিলেন। শুধু মঙ্গল সূত্রের কথা দেখুন দেখবেন মঙ্গল সূত্রের বাংলা কথাগুলো যে কোন ধর্মাবম্বী মেনে নেবে চিরন্তন সত্য বলে। তিনি মহাজ্ঞানী ছিলেন বলেই আড়াই হাজার বছরের অধিক আগেও এমন সত্য প্রকাশ করতে পেরেছেন, যা সার্বজনীনভাবে গৃহীত।

পরিশেষে এটুকুই বলবে যুক্তিবাদের নামে ভণ্ডামিতে জড়িয়ে না পরে, ত্রিপিটক চর্চা করুন। নিজের কাছে সত্য কোনটা মিথ্যা কোনটা দিবালোকের মত স্পষ্ট হবে। আর তাতেই ত্রিপিটকের বিকৃত ব্যাখ্যা থেমে যাবে। বিকৃত করে প্রচারকারীরা এমনিতেই থেমে যাবে। সত্যের জয় সর্বত্র।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=6712

উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু Posted by on Nov 12 2017. Filed under মুক্তমত. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।