Jan 14, 2017
66 Views
0 0

সম্রাট অশোক এবং তার অগ্রমহিষী কী দানের ফলে জগত বিখ্যাত হয়েছিলেন?

লিখেছেন:

সম্রাট অশোক এবং তার অগ্রমহিষী কী দানের ফলে জগত বিখ্যাত হয়েছিলেন?

ইলা মুৎসুদ্দী

12

বহু অতীতে গন্ধমাদন পর্বতে এক প্রত্যেক বুদ্ধ রোগাক্রান্ত হন। সে রোগ নিরাময়ে প্রধান ঔষধ ছিল মধু। সঙ্গী অপর এক প্রত্যেক বুদ্ধ সেই মধু ভিক্ষার জন্যে বারাণসীতে আগমণ করেন। এক দাসী প্রত্যেক বুদ্ধকে অতি আগ্রহ ভরে মধুর দোকান দেখিয়ে দেয়। বুদ্ধ সেই দোকানে উপস্থিত হলে বণিক অত্যন্ত শ্রদ্ধাচিত্তে প্রত্যেক বুদ্ধকে পাত্র পূর্ণ করে মধুদান করে প্রার্থনা করেন, এই দানের প্রভাবে ভবিষ্যতে তিনি যেন সমগ্র জম্বুদ্বীপে একচ্ছত্র অধিপতি হন। তার এই পুণ্য প্রভাবে যেন  উর্ধে-অধে এক এক যোজন ব্যাপী তার আদেশ প্রতিপালিত হয়। মধুবণিক এমন প্রার্থনা করতে দেখে উক্ত দাসী ও প্রত্যেক বুদ্ধকে এক ছোট্ট বস্ত্র খণ্ড দান করেন পাত্রের থলে হিসাবে ব্যবহারের জন্যে এবং প্রার্থনা করেন, এই দানের প্রভাবে তিনি যেন মধুবণিক যখন সম্রাট হবেন, তখন সম্রাটের অগ্রমহিষী হওয়ার সৌভাগ্য হয়। প্রত্যেক বুদ্ধ তখন এই বলে উভয়কে আশীর্বাদ করলেন-

ক্ষিপ্র পূর্ণ হোক তব ইচ্ছা ও প্রার্থনা;

পূর্ণ চন্দ্র সম পূর্ণ হোক রে কামনা।

ক্ষিপ্র পূর্ণ হোক তব ইচ্ছা ও প্রার্থনা;

মণিজ্যোতি প্রভা সম পূর্ণ হোক কামনা।

মধুবণিক আর সেই দাসীর চিত্ত প্রসন্নতা বৃদ্ধির জন্যে প্রত্যেক বুদ্ধ তাদেরই সমক্ষে আকাশ মার্গে গন্ধমাদন পর্বতে প্রস্থান করলেন। তারা উভয়ে যথাকালে মৃত্যুর পর এই পুণ্যে দেবলোকে উৎপন্ন হলেন। তথায় দীর্ঘকাল দিব্যসুখ উপভোগের পর পুণ্যক্ষয়ে দেবলোক হতে পুণঃ মনুষ্যলোকে পাটলিপুত্র নগরে বিন্দুসার রাজার জ্যেষ্ঠপুত্র অশোক কুমার হয়ে এবং দেবকন্যা প্রতিবেশী রাজ্যের রাজকন্যা অসান্ধমিত্রা নামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর অশোক কুমার প্রথম চার বছর প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিনা অভিষেকে রাজ্য শাসন করেন। বুদ্ধের পরিনির্বাণ বর্ষ ২১৮তম বর্ষে তিনি অসন্ধিমিত্রাকে অগ্র মহীষিরূপে বরণ করে রাজ্যাভিষেক প্রাপ্ত হন।

তৎপর হতে তাঁর অতীত পুণ্য প্রভাবে ও জন্মান্তরীণ প্রার্থনার কর্ম বিপাকে পুণ্যঋদ্ধি ও রাজ ঋদ্ধি উৎপন্ন হলে ক্রমে তিনি সমগ্র জম্বুদ্বীপ তথা ভারত উপমহাদেশের একছত্র আধিপত্য অর্জন করেন। প্রতিবেশী কলিঙ্গ রাজ্য জয়ে অবতীর্ণ হয়ে সম্মুখযুদ্ধে যেই ভয়াবহ নরহত্যা হয়, সেই বিভিষিকা স্বচক্ষে দর্শন করে সম্রাট অশোকের মনে যুদ্ধ করে রাজ্য জয়ের ইচ্ছা সম্পূর্ণ ভাবে বর্জিত হয়। তিনি ন্যাগ্রোধ শ্রামণ নামে শান্ত -দান্ত ধীরপদ ক্ষেপে গমণরত এক বুদ্ধ পুত্রের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার প্রেক্ষিতে এবং তাঁরই সাথে আলাপ সান্নিধ্যে বুদ্ধের মহা মৈত্রীময় অপ্র্রমাদী বাণীতে অভিভূত হয়ে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন-

১। শত্রুতায় শত্রুতার সাম্য হয় না কখন;

ক্ষমাতেই মিলে শান্তি, এই ধর্ম সনাতন।

২। অপ্রমাদে অমৃত লাভ, জীয়তে মৃত প্রমত্তে;

অপ্রমাদীর নহে পরাজয়, ধ্বংস হয় প্রমত্তে।

অপ্রমাদের এ বিশেষ গুণে, পণ্ডিত সুজন;

আর্যগোচর অপ্রমাদে প্রমোদিত হন।

এক পর্যায়ে সেই সম্রাট অশোক বুদ্ধ প্রশংসিত সেই অপ্রমত্ততা বিচক্ষণতা আর মৈত্রীময় বন্ধুত্বের মহাবন্ধনে আবদ্ধ করলেন সমগ্র ভারত উপমহাদেশকে। মায়ানমা, শ্রীলংকা, থাইল্যাণ্ড, নেপাল, তিব্বত, ভূটান- সবাইকে আপন প্রেমময় বক্ষে ধারণ করে মহামতি ধর্মরাজ অশোক নামে জগত বিখ্যাত সম্রাট হলেন সেই মধুবণিক। তিনি বুদ্ধের অহিংস মৈত্রীর বাণী দিকে দিকে প্রচারে প্রসারে দিকে দিকে প্রচার দল প্রেরণ করে বিশ্বের মিশনারী ইতিহাসে প্রথম উদ্গাতা হলেন।

পথের ধারে পাষণময় পর্বত গাত্রে, চৌরাস্তায় পাষাণ স্তম্ভে জনহিতকর বুদ্ধ বাণী উৎকীর্ণ করে, রাজপথের উভয় পাশে ছায়াসম্পন্ন বৃক্ষ রোপন, জলসত্র, দিঘী, পুস্করণী খনন, পশুর চিকিৎসালয় স্থাপন প্রভূতি জনকল্যাণ মূলক কর্মকান্ডে বিশ্বের অদ্বিতীয় মহাপ্রাণ সম্রাটে পরিণত হলেন। শুধু তাই নহে তিনি  বুদ্ধ বাণীর দীর্ঘস্থিতি কল্পে তৃতীয় ধর্ম সঞ্চায়ণ অনুষ্ঠান ও স্বীয় সম্রাজ্যের সর্বত্র ৮৪ হাজার চৈত্য নির্মাণ করে তথায় বুদ্ধের পবিত্র আস্থ সংরক্ষণ ও পূজার ব্যবস্থা করে অদ্বিতীয় উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। এমন কি বুদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রতিষ্ঠায় আপন সন্তান পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রাকে প্রব্রজ্যা দান পূর্বক শ্রীলংকায় প্রেরণ করে প্রকৃত বুদ্ধ বাণীর প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণে যেই দূরদর্শীতা প্রদর্শন করেছিলেন, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আজকের পালি ত্রিপিটক গ্রন্থের বুদ্ধবাণী সমূহ।

সূত্র ঃ গল্পে গল্পে মহামঙ্গল, অনুবাদক ঃ প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।
Article Categories:
প্রবন্ধ
http://www.thebuddhisttimes.com

ইলা মুৎসুদ্দি। সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক। ই-মেইল:

Leave a Comment

error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।