সিদ্ধার্থ গৌতমের গৃহ ত্যাগ

Smiley face

চার নিমিত্ত দর্শনের পরে সিদ্ধার্থ গৌতমের মনে শান্তি নেই। সব সময়ই তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। ঐ তরুণ সন্ন্যাসীর গভীর ধ্যানমগ্ন দৃশ্যটি গৌতমের মনে দাগ কেটেছে। তিনিও দুঃখমুক্তির সন্ধানে গৃহত্যাগ করবেন সিদ্ধান্ত নিলেন। গৃহত্যাগের আগে তিনি পিতার অনুমতি নেওয়ার কথা ভাবলেন। পিতার নিকট গিয়ে তিনি তাঁর সংকল্পের কথা জানালেন। পুত্রের কথা শুনে রাজা যেন বজ্রাহত হলেন। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে প্রাণাধিক পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি শাক্যরাজ্যের রাজপুত্র, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, তোমার কিসের অভাব যার জন্যে তুমি সংসার ত্যাগ করতে চাও? সিদ্ধার্থ উত্তরে বললেন, চারটি বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে পারলে আমি সংসারত্যাগ করব না :

১. আমি কোনোদিন জরাগ্রস্ত হব না, চিরযৌবনপ্রাপ্ত হব;

২. আমি কোনোদিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হব না;

৩. মৃত্যু কোনোদিন আমার জীবন কেড়ে নেবে না এবং

৪. অক্ষয় সম্পদ যেন আমি লাভ করি।

পুত্রের শর্ত শুনে রাজা অবাক হয়ে বললেন, এ অসম্ভব! জরা, ব্যাধি, মৃত্যুকে রোধ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এ-শর্ত প্রত্যাহার কর পুত্র। তখন সিদ্ধার্থ বলরেন, মৃত্যুও যে-কোনো সময় আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। আমি গৃহত্যাগ করার সংকল্প করেছি। রাজা বুঝতে পারলেন মহৎ কর্তব্যসাধনে পুত্র সংকল্পবদ্ধ, তাঁকে আর বেঁধে রাখা যাবে না। তিনি সিক্ত কণ্ঠে বললেন, পুত্র! তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হোক। পিতাকে প্রণাম করে অশ্রুসজল নয়নে সিদ্ধার্থ পিতৃকক্ষ ত্যাগ করলেন।

এর মধ্যে গোপাদেবীর কোল আলো করে একটি পুত্র সন্তানজন্ম নিল। পুত্রের জন্মের খবর পেয়ে গৌতম নিজের অজান্তে বলে উঠলেন, “রাহু জন্মেছে, বন্ধন উৎপন্ন হয়েছে।” দূতমুখে এ কথা জানতে পেরে রাজা শুদ্ধোদন পৌত্রের নাম রাখলেন ‘রাহুল’। এদিকে গৌতম সিদ্ধান্ত নিলেন, এ-বন্ধন ছিন্ন করতে হবে। ওদিকে রাজা গৌতমকে আনন্দে রাখার জন্য নৃত্য গীতের আয়োজন করলেন। কিন্তু সিদ্ধার্থ আমোদ-প্রমোদে মনসংযোগ করতে পারলেন না, ঘুমিয়ে পড়লেন। নর্তকীরাও কুমারকে নিদ্রিত দেখে ইতস্ততভাবে এখানে-সেখানে ঘুমিয়ে পড়ল। গৌতম জেগে উঠে এদের এলোমেলোভাবে ঘুমন্ত দেখে আরও বিরক্ত হলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আজই গৃহত্যাগ করতে হবে। আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাত, জ্যোৎস্নায় আলোকিত নগরী। কুমার শেষবারের মতো গোপাদেবীর ঘরে গেলেন। দেখলেন শিশুপুত্র রাহুল মায়ের সঙ্গে ঘুমাচ্ছে। পুত্রের নিষ্পাপ মুখখানা দেখে তিনি একটু মায়া অনুভব করলেন, ভাবলেন, একটু আদর করবেন। কিন্তু আদর করতে গেলে গোপা জেগে উঠতে পারেন। নিজেকে নিবৃত্ত করলেন। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সারথি ছন্দককে ডেকে তুললেন।নির্দেশ দিলেন ঘোড়াকে প্রস্তুত করতে। ছন্দক অশ্বরাজ কন্থককে সজ্জিত করে নিয়ে এলেন। সিদ্ধার্থ গৌতম কন্থকের পিঠে চড়ে নগর থেকে বেরিয়ে ছুটে চললেন। তারপর তিনি অনোমা নদীর তীরে পৌঁছালেন। এবার বিদায়ের পালা। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে গৌতম তরবারি দিয়ে নিজের দীর্ঘ কেশ কর্তন করলেন। রাজপোশাক ও অলংকারগুলো খুলে ফেললেন। মুকুটটি ছন্দকের হাতে দিয়ে বললেন, “পিতাকে দিও।” রাজপোশাক ও অলংকার মায়ের হাতে দিতে বললেন। গোপাদেবীকে তাঁর পাদুকাদ্বয় আর পুত্র রাহুলকে সোনার তরবারি দিতে বললেন। আদেশ দিলেন, ছন্দক তুমি এবার ফিরে যাও। গৌতমের বিয়োগব্যখা সইতে না পেরে কন্থক তখনই প্রাণত্যাগ করল। শোকাচ্ছন্ন ছন্দক ফিরে গেলেন কপিলাবস্তুতে। রাজপুত্র রাজসুখ ত্যাগ করে হলেন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী। গৌতম একাকী হেঁটে চললেন অনোমা নদীর তীর ধরে গভীর বনের দিকে।আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে উনত্রিশ বৎসর বয়সে সিদ্ধার্থের এই গৃহত্যাগ বৌদ্ধ সাহিত্যে ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’ নামে অভিহিত।

Facebook Comments

বৌদ্ধদের আরো তথ্য ও সংবাদ পেতে হলে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন।: www.facebook.com/buddhisttimes

দি বুড্ডিস্ট টাইমস.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। এখানে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি যে কেহ লিখতে পারেন দি বুড্ডিস্ট টাইমস এ। দি বুড্ডিস্ট টাইমস এর সাথে লেখ-লেখিতে যুক্ত হতে চাইলে ব্যবহার বিধি ও নীতিমালা পড়ুন অথবা নিবন্ধন করুন
এখানে।

Short URL: http://thebuddhisttimes.com/?p=2399

ধম্মবিরীয় ভিক্ষু Posted by on Aug 11 2016. Filed under এক্সক্লুসিভ, বুদ্ধের জীবনী. You can follow any responses to this entry through the RSS 2.0. You can leave a response or trackback to this entry

1 Comment for “সিদ্ধার্থ গৌতমের গৃহ ত্যাগ”

  1. Intekhaab Siddiquee

    ‘সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ’ আমার একটা কবিতার নাম। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।
    সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ
    ______________________

    জাগো জাগো গোপা ঘুমায়োনা আর
    স্বামী যে তোমার নাগালের পার
    ত্যগিবে প্রাসাদ অচিরেই আর
    আসিবে না ফিরে ঘরে।

    ঘুমাইয়া থাক যদি এইক্ষন
    দেবতা তোমারে ত্যজিলে তখন
    জীবন ভরিয়া করিবে রোদন
    হারাইয়া চিরতরে।

    কুমার বসিয়া ভাবিছে বিরলে
    যেতে হবে আজ সব কিছু ফেলে
    ত্যাজিয়া প্রাসাদ সব অবহেলে
    মানিয়া দৈব বাণী।

    লইবে সে গিয়া পিতৃ অনুমতি
    বাহির হইবে পরে দ্রুত গতি
    জাগিয়া উঠিলে নিদ্রিতা সতী
    না দিবে যাইতে জানি।

    প্রাসাদ চৌদিকে আলোকিত হয়
    হয়েছে কি ভোর রাজায় শুধায়
    প্রবেশিল কুমার যখন সেথায়
    রাত্রি দ্বিপ্রহরে।

    কহিল পিতারে সময় এসেছে
    বাহির বিশ্ব আমারে ডাকিছে
    এসেছি অনুমতি নিতে তব কাছে
    ফিরায়ে দিও না মোরে।

    রাজা শুনে হায় দুঃখে অতিশয়
    কুমারে শুধায় পেয়ে বড় ভয়
    নহে তো আজিকে যাবায় সময়
    ভেবে দেখো আরবার।

    ঘরেতে তোমার পুত্র জায়া আছে
    কি বলিবে তুমি তাহাদের কাছে
    পাই আমি ভয় দেবতারা পাছে
    ক্রুদ্ধ হয় তোমা পর।

    কহ তুমি মোরে কিবা বর লবে
    পূরাব আশা যা কিছু চাহিবে
    যা কিছু আমার সাধ্য এ ভবে
    অন্যথা নাহি হবে।

    পার যদি তুমি দেহ মোরে বর
    চাই হেথা আমি হইতে অমর
    জরা, ব্যাধি কভু না জানে শরীর
    অতুল বিভব ভবে।

    শুনিয়া কুমারে রাজা কাতর স্বর
    চাহিছ যা আজি সাধ্য নাহি মোর
    ঋষিরাও না পারে হইতে অমর
    সাধিয়া জনম ধরে।

    আমি চলে গেলে না হবে কাতর
    দাও তবে বর কহিল কুমার
    বাসনা না যেন জাগে ফিরিবার
    আর এই সংসারে।

    দেব মায়াজালে নগর ঘুমায়
    কুমার ভাবিছে এই তো সময়
    পালংক হতে নামিয়া দাঁড়ায়
    রত্নরাজি খুলি ধীরে।

    প্রণমিল যত বুদ্‌ধ ধরায়
    আকাশ পানেতে ক্ষণিক তাকায়
    হেরিল গগনে দেবেরা নতকায়
    তাহার পূজার তরে।

    ছন্দকে ডাকি কহিল কুমার
    আনো ত্বরা করি অশ্ব আমার
    প্রভাত হইতে নাহি দেরী আর
    অধিক নাহিক সময়।

    এখনই যাওয়ার নাইতো কারণ
    পরেতে যাওয়ার না আছে বারণ
    কাটাও কিছুকাল সুখের জীবন
    ছন্দক কুমারে শুধায়।

    নহে এ ছন্দক মুহূর্তের ঘোর
    প্রতিজ্ঞা আমার কঠিন কঠোর
    আজিকেই আমি হইব বাহির
    রাজগৃহ পিছে ফেলি।

    মাথায় যদিও পড়ে বজ্র কঠিন
    অশনি যদি হয় তেমনি ভীষন
    হইলেও অবিরত শর বরিষণ
    চলিব সমস্ত দলি।

    ছন্দক কি করে ভাবিয়া না পায়
    প্রভুরে তাহার অশ্ব আনি দেয়
    কাঁদিতে কাঁদিতে আবারো শুধায়
    ফিরিতে গোপার কাছে।

    অশ্বের পিঠে আরোহে কুমার
    ইন্দ্র খুলি দেয় বন্ধ যত দ্বার
    কুমার চলিল প্রাসাদের বার
    ছন্দক চলে তার পিছে।

    মায়াঘুমে আজ সকলে বিভোর
    পুরবাসী সবে ঘুমায় অঘোর
    জেগে আছে শুধু ছন্দক আর
    কুমার তাহার সাথে।

    কাঁদিয়া আকুল পুরদেবতা
    শাক্য বংশের রক্ষাকর্তা
    নীরব অশ্রু বহাইছে সেথা
    বিলাপিছে নিজ সাথে।

    বাহিরিয়া পথে পিছনে তাকায়
    পুরাতন কথা মনে পড়ি যায়
    তবুও কুমার কাতর না হয়
    সংকল্পে অটুট থাকে।

    ইন্দ্র সমুখে পথ দেখায়ে
    দেবতারা পথে পুষ্প ছড়ায়ে
    সারা পথ দিব্য বাদ্য বাজায়ে
    নিয়ে চলে আজ তাকে।

You must be logged in to post a comment Login

Smiley face

সর্বশেষ টাইমস

Recent Posts: NivvanaTV covering Buddhist and Buddhist community in World, with weekly news, views, entertainment, and programs for all age.

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

সুপ্রিয় চাকমা শুভ,রাঙামাটি সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৬০টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিদেশী দাতা সংস্থা দি স্যালভেশন আর্মী বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৯ জানুয়ারী) সকালে বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ানা পাংখোয়া প্রধান অতিথি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। […]

Photo Gallery

Top Downloads

Icon

The Buddhist Times Android apps 46.21 KB 54 downloads

...
Icon

অভিধর্ম্মার্থ সংগ্রহ 1.65 MB 1 downloads

গ্রন্থের নামানুসারে ইহা একটি অর্থ-সংগ্রহ...
Developed by Dhammabiriya
error: অনুগ্রহ করে কপি/পেস্ট মনোভাব পরিহার করি নিজে লেখার যোগ্যতা অর্জন করুন।